স্কুল ফিডিং, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও গার্মেন্টস শ্রমিক এবং টিআর (টেস্ট রিলিফ) খাতে খাদ্যশস্য বিতরণ বন্ধ রয়েছে। দুস্থ মহিলা উন্নয়ন (ভিজিডি), দুস্থদের খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ), মুক্তিযোদ্ধা, কাবিখা ও জিআর (খয়রাতি সাহায্য) খাতেও বিতরণ করা হচ্ছে নামমাত্র খাদ্যশস্য। ফলে ওএমএসের (খোলাবাজারে বিক্রি) ওপর চাপ বেড়েছে। অথচ অর্থবছর শেষ হওয়ার ৫ মাস আগেই প্রায় শেষ হয়ে গেছে ওএমএসের বরাদ্দ। ফলে ওএমএসের চাল-আটা না পেয়ে গরিব মানুষ খালি হাতে ফিরছে। বর্তমানে শুধুমাত্র দেশের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় ওএমএস চালু রয়েছে। অন্যান্য খাতে খাদ্যশস্য বিতরণ বন্ধ ও কমে গেলেও উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ওএমএস চালু নেই। এমন অবস্থায় আসন্ন রমজানে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। সেজন্য জনপ্রতিনিধিরা ওএমএসের বরাদ্দ বাড়াতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ডিও (আধা-সরকারি পত্র) দিয়েছেন। খাদ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাজারে চালের দামের ঊর্ধ্বগতি ও করোনা মহামারিতে গরিবের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিতরণ সংকুচিত হওয়ায় ওএমএসের ওপর চাপ বাড়ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ওএমএসের জন্য বরাদ্দ ছিল দেড় লাখ টন চাল ও দুই লাখ টন ৬৩ হাজার ১৫৮ টন আটা। কিন্তু ৬ মাসেই ওই বরাদ্দ প্রায় শেষ হয়ে যায়। তারপর গত জানুয়ারি মাসে ফের ৩ লাখ টন চাল ও এক লাখ টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়। অতিরিক্ত বরাদ্দের পরও অর্থবছর শেষ হওয়ার ৫ মাস আগেই ৭২ ভাগ চাল শেষ হয়ে গেছে। আর আটা শেষ হয়েছে ৮৬ ভাগ। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে ওএমএসের আটা বিতরণ কমানো হয়েছে। তার আগে গত ১ ডিসেম্বর থেকে চাল ও আটার বিক্রি কমানো হয়েছিল। তবে জানুয়ারিতে অতিরিক্ত বরাদ্দের পর বিতরণ বাড়ানো হয়।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী করোনার আগে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪০ লাখ। করোনার কারণে আরো ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। ফলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৬ কোটি ৮০ লাখে ঠেকেছে। অথচ সারাদেশে প্রতিদিন মাত্র ২ হাজার ২৮৭ টন চাল ও এক হাজার ৬৫২ টন গমের আটা বিক্রি করা হচ্ছে। ডিলারদের দোকান ও খোলা ট্রাকের মাধ্যমে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা ও আটা ১৮ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। একজন ক্রেতা একবারে সর্বোচ্চ ৫ কেজি করে চাল ও আটা কিনতে পারে। অল্প সংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষকে বাজারের তুলনায় কম দামে চাল ও আটা সরবরাহ করা হলেও বাজারে পণ্যের দাম কমেনি।
সূত্র আরো জানায়, ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে দুস্থ মহিলাদের মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণ করা হয়। পুষ্টি জোগান দিতেই আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, জিঙ্ক মিশ্র পুষ্টিচাল বিতরণ করা হয়। তবে করোনাকালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়লেও ভিজিডির সংখ্যা বাড়ানো হয়নি। এখন ১০ লাখ ৪০ হাজার দুস্থ নারী ওই সেবা পাচ্ছে। তাতে দেশের ৪৯২টি উপজেলার ৪ হাজার ৫৬৫ ইউনিয়নে গড়ে মাত্র ২২৮ মহিলাকে ভিজিডি দেয়া হচ্ছে। যা নামমাত্র। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় করোনাকালে ১০ শতাংশ উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। কারণ দরিদ্র পরিবারের শিশুরা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। অনেকে শিশু ক্ষুধার জ¦ালায় স্কুল ছেড়ে কাজে যুক্ত হয়েছে। তারপরও স্কুল ফিডিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আর গার্মেন্ট শ্রমিকদের মধ্যে খাদ্যশস্য বিতরণের ইনোভেশন আইডিয়াও বন্ধ রেখেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। তাছাড়া চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ২০০৯ ও ২০১০ সালে সরকার তাদের কার্ড দিয়েছিল। তারপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে খাদ্যশস্য পৌঁছে দেয়া হতো। তার মধ্যে কর্মচারীদের দীর্ঘদিন বেতন বাড়েনি। তারপরও কর্মচারীদের ওই কর্মসূচি বন্ধ রয়েছে।
এদিকে এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মাৎ নাজমানারা খানুম জানান, যেভাবে ওএমএস বিতরণ করা হচ্ছে তাতে এপ্রিলের মধ্যে অতিরিক্ত বরাদ্দের চাল-আটাও শেষ হয়ে যাবে। রমজানের বিবেচনায় অর্থ বিভাগে বরাদ্দ চেয়ে ফের চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওএমএস সর্বোচ্চ পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে। এ মুহূর্তে আর বাড়ানো সম্ভব নয়। অন্যান্য খাতের বরাদ্দ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বাড়াতে হবে। তারপর খাদ্য মন্ত্রণালয় শুধু খাদ্যশস্য সরবরাহ করবে। ভিজিডি ও স্কুল ফিডিংয়ের মতো কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। আর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের খাদ্যশস্য বিতরণ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর শুধু একবার বিতরণ করা হয়। তারপর বন্ধ রয়েছে।