ব্যবসায়ী আবু মহসিন খান ফেসবুক লাইভে এসে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যা করেন- এই সংবাদ সমাজের বাস্তব চিত্রকে ভিন্নভাবে উন্মোচিত করেছে। একসময় যিনি ছিলেন বড় এক ব্যবসায়ী, অর্থ বিত্তের কমতি ছিল না; সেই বিত্তবান কী করে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে বাধ্য হন সেই বিষয়টি চিন্তা করলে স্পষ্ট যে, বিত্ত কিছু সময়ের কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে মাত্র। কিন্তু বিত্তের বৃত্তে যার জীবন আবদ্ধ, সেই বিত্তের কালচারই মানুষকে নিঃসঙ্গ করত পারে। শুধু সময় পার হলেই সেই করুণ চিত্র বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না।
অত্যাধুনিক এই যুগ হলো দ্রম্নত সময়ে বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ক্রিয়া সম্পাদনের যুগ। যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব, মেসেঞ্জার, ভাইভার, হোয়াটসঅ্যাপ এসে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এমন এক বিপস্নব নিয়ে আসে। যার ফলে মানুষ যে যেখানেই থাকুক ইচ্ছে করলে যে কারো সঙ্গে যে কোনো সময় যোগাযোগ করতে পারে, কথা বলতে পারে, ভিডিওতে লাইভে একে অন্যকে দেখতে পারে। দেশ-বিদেশ এখানে একাকার। অথচ, যোগাযোগের এমনই যুগে দেখি মানুষ দিনে দিনে একা হয়ে যাচ্ছে, একাকিত্বের মাত্রা বেড়ে উঠছে, নিঃসঙ্গ জীবনের পথে হামাগুড়ি দিয়ে চলছে; মরণের আগেই যেন মরে যাচ্ছে বেঁচে থাকার অনুভূতিগুলো। কেন এমনটি হচ্ছে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের সবাইকে।
প্রত্যেকের মা বাবা তাদের জীবনের সমস্ত শক্তি সামর্থ্য উজাড় করে সন্তানদের গড়ে তোলেন, প্রতিষ্ঠিত করেন। সন্তানদের জীবনের মধ্য দিয়েই পিতামাতা নিজের জীবনী শক্তি অনুভব করেন। সন্তানদের জন্য ত্যাগ আর কোরবানিকে ভালোবাসার রসদ মনে করেন। সেই সন্তান যখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় তখন পিতামাতার চিত্ত সবচেয়ে বেশি প্রফুলস্ন হয়। মা বাবা বৃদ্ধ হতে থাকে, কিন্তু একসময় অনেক মা-বাবাকে দেখতে হয় সন্তানদের করুণ পরিণতি! কে পিতামাতার দায়িত্ব নেবে- এই নিয়ে যখন সন্তানদের মধ্যে রেষারেষি চলতে থাকে, তখন পিতামাতার মনে আক্ষেপ হয় আমার সন্তানদের মন মানসিকতা এত নিচ কেন? উচ্চশিক্ষিত হলেও কেন তাদের মনকে এত নিচু করে ফেলে? বহু পরিবারে নিজ পিতা বা মাতার দায়িত্বনেওয়াকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ লেগেই থাকে। সেই বিবাদ থেকে বৃদ্ধাশ্রমের আওয়াজ শোনা যায়। সেই আওয়াজ শুনতে পেলে বহু মা-বাবা বলে উঠেন- হায়! এই কথা শোনার আগে আমার মরণ হয়নি কেন?
এদিকে সমাজের তথাকথিত এলিট শ্রেণি থেকে বলা হয়, বৃদ্ধাশ্রমে পিতামাতাকে রাখার ব্যবস্থাটাই হতে পারে একটা উচ্চতর সমাধান। এতে করে বৃদ্ধদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় হবে, পরস্পর গল্প করে কাটিয়ে দেবে তাদের সময়। পাশ্চাত্যের উদাহরণ নিয়ে এসে বলা হয়, বৃদ্ধাশ্রমের এই ব্যবস্থা প্রগতিশীল; আর চলমান ধারাটাই পশ্চাৎপদ। পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে আমরা নিজের পিতামাতাকে সেই বিজাতীয় কালচারের অংশ বানিয়ে ফেলি। এটাই আমাদের বড় ধরনের পশ্চাৎপদতা। প্রশ্ন হলো, বৃদ্ধাশ্রমের কালচার মেনে নেওয়ার চিন্তা কেন আসবে?
এর প্রধান কারণ, পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্বহীনতা, আর অকৃতজ্ঞতার বীজ হৃদয়ে বপন করা। উচ্চশিক্ষা আর অঢেল সম্পদ মানুষের হৃদয়কে প্রশস্ত করতে পারে না। মানুষ নিজের জীবনকে যত বেশি আয়েশ আর সম্পদের বাহাদুরির দিকে নিয়ে যাবে তত বেশি মাত্রায় সে কূপমন্ডূক হয়ে যাবে। সেই কূপমন্ডূকতার জায়গা থেকে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা আসে। এর মানে অকৃতজ্ঞতার মতো বর্বর অনুভূতি আসে তখনি যখন মানুষ বস্তুর চার দেওয়ালের মধ্যে সুখের অনুসন্ধান চালায়। সে কারণে, নিজের মা-বাবাকে বৃদ্ধ নিবাসে রেখে সুখে শান্তিতে থাকার চিন্তাটা বড় আকারের পশ্চাৎপদতা- যা প্রগতিশীলতার ঠিক বিপরীত। সন্তানদের গড়ে তোলার জন্য মা-বাবা নিজের সুখ-শান্তি, আরাম আয়েশ ভুলে যান, সন্তান যখন প্রতিষ্ঠিত হবে তখনো সন্তানরা নিজেদের সুখ-শান্তির চিন্তা করতে গিয়ে মা-বাবাকে বৃদ্ধ নিবাসে রেখে আসবে এটা নির্মম স্বার্থপরতার নগ্ন প্রকাশ।
এটা নির্মম এজন্য যে, স্বামী আর স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে, কিন্তু মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের কোনো বিচ্ছেদ হয় না। অতি আধুনিকতার এই যুগে এসে সন্তানরা যদি মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে- সেটা হলো সন্তানদের পক্ষ থেকে মা-বাবাকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া। অথবা নিজের পিতামাতাকে এতিমের মতো মনে করা।
হয়তো কেউ বলবে, সন্তানরাই তো বৃদ্ধাশ্রমে মা বাবার জন্য টাকা পাঠায়, তাহলে এটা কী করে রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়? অথবা কী করে এতিমের মতো মনে করা হয়? এখানে টাকা দেওয়াটা মা-বাবার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ নয়, এটা হলো মা বাবাকে শাস্তি দেয়া। অথবা এতিমখানার মতো, যেখানে অনেকেই দান করে। টাকাই যদি আসল কথা হয়, তাহলে টাকার বিনিময়ে মা-বাবা কি নিজ সন্তানদের লালন-পালনের জন্য শিশু আশ্রমে রাখতে রাজি হবে? কেন রাজি হবে না? এটাই অকৃত্রিম ভালোবাসা।
অথচ সন্তান প্রতিষ্ঠিত হলে মা-বাবার প্রতি সেই ভালোবাসা অনেকের ক্ষেত্রে কেন হারিয়ে যায়? কেনই বা সন্তানদের মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধ নষ্ট হয়ে যায়? এটা হলো নিজেকে বস্তুতে পরিণত করার ফল। প্রতিষ্ঠিত সন্তান যখন বস্তুতে পরিণত হয়, তখন সেই সন্তান মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ হারিয়ে ফেলে। কীভাবে একজন সন্তান বস্তু থেকে সত্তাগত মানুষ হয়ে উঠতে পারে- সেই শিক্ষা ও চেতনা অর্জন করতে না পারলে 'বৃদ্ধ নিবাস' ধারণাটা ঘুরে ফিরে আসবে, আধুনিকতার প্রলেপ দিয়ে। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা ভুল জায়গায় ভালোবাসি, আর ভুল জায়গায় অর্থ খরচ করি।
বস্তুর রঙ্গে রঞ্জিত মানুষ যত উচ্চমানের যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করুক না কেন, পুঁজি ও বস্তুবাদিতার এই বিশ্বায়নে মানুষ বিত্তের পেছনেই ছুটবে, আর এই বিত্তের রঙে গড়ে উঠা মানুষরা বিত্তের পূজাই করবে; এই বিত্তই সময়ের পরিক্রমায় মানুষকে ফেলে দেবে নিঃসঙ্গের অন্ধ কোঠরে। রং মাখা বিত্ত বৈভব পূজার গর্ভ থেকে জন্ম হয় নিঃসঙ্গ মানবেতর জীবনের করুণ আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ শিকড় থেকে বিচ্ছিন্নতার ফল। সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার সেই পুরনো কালচারের মধ্যে প্রত্যাবর্তন ছাড়া নতুন জীবন লাভের কোনোই সম্ভাবনা নেই।
ড. আশেক মাহমুদ : সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়