এবারও সাতক্ষীরার তালা উপজেলার সুড়িখালি বিলের প্রায় ৫শ’ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রভাবশালীদের স্বার্থে বন্ধ রাখায় ওই বিলটি গত বছরের ন্যায় এবারও জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এতে হুমকির মধ্যে পড়েছে ধানচাষের লক্ষ্যমাত্রা এবং একইসাথে বিপাকে পড়েছেন দরিদ্র কৃষকসহ জমির মালিকরা।
স্থানীয়রা জানান, তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নের মুড়াগাছা মৌজার বিশাল এলাকা জুড়ে সুড়িখালি বিল। এই বিলে প্রায় দুইশত কৃষকের আনুমানিক ৭শ’ বিঘা কৃষি জমি রয়েছে। অধিকাংশ জমিতে আমন এবং বোরো চাষ হয়। পানি নিষ্কাশনের সুবিধা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে ধানের চারা নষ্ট হয়ে যায়। বিলটি খেশরা ইউনিয়নের মুড়াগাছা গ্রাম থেকে পশ্চিমে দরমুড়াগাছা পর্যন্ত এবং দক্ষিণে মুড়াগাছা থেকে উত্তরে শালিখা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সুড়িখালি বিলের যৎসামান্য অংশে মাছের ঘের। বেশিরভাগ জমিতে ধান চাষ করা হয়। সম্প্রতি সামান্য বৃষ্টিতে বিলটি সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। এই ঘটনার নেপথ্যে-সরকারি বন্দোবস্ত পাওয়া খাস জমি অবৈধভাবে বিক্রি করার পর প্রভাবশালীরা ওই জমির উপর বাঁধ দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়াকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগী চাষীরা।এবিষয়ে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ ওয়াদুদ, মিরাজ সরদার, তপন সেন, নুর মোহাম্মদ সরদার ও সিদ্দিক শেখসহ একাধিক কৃষক জানান, বিলের ৩০৫১ দাগের ৬৬ শতক জমি বিগত ১৯৮৮-৮৯ সনে সরকার মুড়াগাছা গ্রামের ভুমিহীন গোসাই অধিকারীকে বন্দোবস্ত দেয়। ওই গোসাই অধিকারীর পুত্র কার্তিক অধিকারী বিগত কয়েকবছর পূর্বে মুড়াগাছা গ্রামের মৃত সৈয়দ নুরুল ইসলামের পুত্র সৈয়দ সেকান্দারের কাছে বিক্রয় করে। পরে সৈয়দ সেকান্দার ওই ক্রয়কৃত জমি ও তৎসংলগ্ন সরকারি খালে বাঁধ তৈরি করে বিলের পানি অপসারণে বাঁধার সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে ওই বিলের জমি-জোতদারগণ গতবছর তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দায়ের করলে তিনি সংশ্লিষ্ট খেশরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে পানি অপসারণের জন্য পাইপ স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করেন। জমি-জোতদারগন পাইপ স্থাপন করতে গেলে সৈয়দ সেকান্দারগং সেই পাইপগুলো স্থাপনে বাধা প্রদান করে। এনিয়ে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী ঘের ব্যবসায়ীদের সহযোগীতায় সৈয়দ সেকেন্দার আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।অপরদিকে একই বিলসংলগ্ন পাকা রাস্তার অপরপার্শ্বে ২৬২০ দাগের সরকারি বন্দোবস্তকৃত ৯৯শতক জমিতে মৎস্যচাষ করে মুড়াগাছা গ্রামের মৃত বারিক সরদারের ছেলে তৈয়ব সরদার। সরকার তাকে ৯৯শতক জমি বন্দোবস্ত দিলেও তিনি ওখানে সুড়িখালি বিল-শালিখা নদী সংযোগ খালের ৫০শতকসহ প্রায় ১৪৯শতক জমি আওতাধীন রেখে মৎস্য চাষ করেন। ফলের বিলের ওই অংশ দিয়ে শালিখা নদীতে পানি নিষ্কাসন বন্ধ থাকায় সুড়িখালি বিল জলাবদ্ধ হচ্ছে এবং শ্রাবণ মাসের অর্ধেক চলে গেলেও ঐ বিলের জমির মালিকগন একজনও এখনও ধানের বীজতলা তৈরি করতে পারেনি। খেশরা ইউনিয়নের মুড়াগাছা গ্রামের কৃষক নাসির সরদার জানান, বিলে তাদের ৫বিঘা জমি রয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে কোন কিছুই চাষাবাদ করা যায় না। আবার বৃষ্টি হলে অনেক সময় ধান ঘরে তুলতে পারেন না, জমিতেই নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় ধান ঘরে তুলতে পারলেও ধান পানিতে নষ্ট হওয়ায় চালও ভাল হয়না।সুড়িখালি বিল কেন্দ্রিক কৃষক আলাউদ্দিন সরদার, নুর মোহাম্মদ সরদার, জাহিদ শেখ, বিশ্বজিৎ সেন, মতিয়ার সরদার, পলাশ সরদার, জহুরুল শেখ সহ অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্রাবণ মাস শেষ হতে চললো অথচ বিলে আমন ধান আবাদের জন্য আমরা এখনও ধানের চারা তৈরীর বীজতলা প্রস্তুত করতে পারিনি ও সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হয়তো আমনচাষ করতেই পারবোনা। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বহুবার পরিদর্শন করে গেলেও কেউ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেননা।এবিষয়ে স্থানীয় এমএ ওয়াদুদ বলেন-সুড়িখালি বিলে আমার প্রায় ১০বিঘা জমি আছে। বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রায় এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পুরাতন খালটি পুনঃখনন করা প্রয়োজন, যেটা শালিখা নদীতে গিয়ে পড়বে। তাহলে বিলসহ পুরো এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব হবে। এতে করে ওই বিলে থাকা জমির কৃষকদের অভাবনীয় উপকার হবে।’খেশরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম লাল্টু বলেন, পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যুগযুগ ধরে জলাবদ্ধতার কারণে অনাবাদি থেকে যাচ্ছে সুড়িখালি বিলের জমি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বারবার জানানো হয়েছে। আজও এডিসি কাজী আরিফুর রহমান এসেছিলেন, তিনি সরেজমিনে দেখে গেছেন। পানি অপসারণের বিষয়ে এ বছর আমরা আশাবাদী। কৃষকদের দাবির সাথে একমত পোষণ করে তালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হজিরা খাতুন বলেন, বিলটি দুই ফসলি। তাও জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রন্থ হয়। বিলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা করতে না পারলে গত বছরের ন্যায় এবারও বোরো ও আমন দুই মৌসুমেই আবাদ করা সম্ভব হবেনা। এ বিষয়ে সৈয়দ সেকেন্দারের কয়েক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি