বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটার সমূহ সম্ভাবনা নিয়ে গর্বিত পথচলার দেড় বছর অতিক্রম করেছে বাংলাদেশের নিজ অর্থায়নে নির্মিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু। খুলনা ও বেনাপোল অংশের বাণিজ্যিক সুবিধা এতে বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও পণ্যবাহী ট্রাকগুলো এখনো পদ্মাসেতু এড়িয়ে চলছে।
পদ্মা সেতুর তুলনায় ওইসব পণ্যবাহী ট্রাক আরিচা হয়ে ফেরী পারাপারকে সহজ ও সাশ্রয়ী মনে করছে। এদিকে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাসহ ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরিয়তপুর এবং গোপালগঞ্জ এলাকার মানুষের চোখেমুখে এখনো স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা ঝুলে রয়েছে পদ্মা সেতুকে ঘিরে। সুশীল সমাজের দাবি, স্বপ্ন পূরণের স্বপ্নে বিভোর দক্ষিণাঞ্চলবাসীর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এখন জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন বরিশাল বিভাগীয় শহরে বাণিজ্যিক অবয়ব তৈরি করা। পাশাপাশি ভাঙা থেকে দেশের সর্বদখিণের সাগরকন্যা কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে দ্রুত ছয়লেনে উন্নতী করা। যা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ২৯ ডিসেম্বর বরিশাল নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যানে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন। যা এখন দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চান দক্ষিণাঞ্চলবাসী।
সূত্রমতে, ২০২২ সালের ২৫ জুন বহুল কাঙ্খিত স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধণ করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলাকে সরাসরি এশীয় সড়কে সম্পৃক্ত করতে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি। পদ্মা সেতু হয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হবার পর গত বছরের ১ নভেম্বর খুলনা থেকে ‘সুন্দরবন এক্সপ্রেস’ ও পরেরদিন ২ নভেম্বর বেনাপোল থেকে ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় চলাচল শুরু করেছে। এর মধ্যদিয়ে খুলে যায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার ভাগ্যের চাকা। ট্রেনে পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে উচ্ছ্বসিত সাধারণ মানুষ। কিন্তু এখানেও বঞ্চিত থেকে যায় বরিশাল।
ছয় লেনের আধুনিক সড়ক ॥ পদ্মা সেতুর শতভাগ সুফল দক্ষিণাঞ্চলবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে দেশের সর্ব দখিণের সাগরকন্যা কুয়াকাটা পর্যন্ত ছয় লেনের আধুনিক সড়ক করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর বরিশাল নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যানে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণায় বরিশাল অঞ্চলের সাধারণ নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এখন তা দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চান সচেতন দক্ষিণাঞ্চলবাসী।
ছয়লেনের আধুনিক সড়ক করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ওই জনসভায় তার ভাষনে বলেছেন, এজন্য ইতোমধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ হয়ে গেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, আধুনিক সড়কের কাজ সম্পন্ন হলে বরিশাল অঞ্চলে আর কোনো কষ্ট থাকবে না। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস বরিশালে আনারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বরিশালের সন্তান প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তাপস, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি প্রফেসর শাহ্ সাজেদা, এনায়েত হোসেন শিবলু, কাজী মিজানুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতুর শতভাগ সুফল পেতে বরিশাল বিভাগের পাশাপাশি ছয় জেলায় অবকাঠামো ও শিল্পায়ন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস দ্রুত বরিশালে আনতে হবে এবং ঢাকার উপর থেকে চাপ কমাতে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাময় বরিশাল ও খুলনা বিভাগের গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত বলেন, স্বপ্নের পথে হাঁটতে একটু সময় লাগে। পদ্মা সেতুর সুফল পেতে আমাদের সবার আগে গ্যাস প্রয়োজন। সরকার ভোলা থেকে গ্যাস আনার বিষয়ে অলরেডি কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে এখন ছয় লেনে উন্নীত করা জরুরি হয়ে পরেছে। যাও প্রধানমন্ত্রী দ্রুত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিভাগীয় শহর বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম তার প্রতিটি জনসভায় বরিশালবাসীকে গ্যাস ও ইপিজেডসহ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার আশ্বাস দিচ্ছেন। নির্বাচনে দ্বিতীয়বারও জয় লাভ করার আনন্দ নিয়ে তিনি বলেছেন, মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতকে সাথে নিয়ে বরিশালকে অনন্য উদাহরণ হিসেবে তৈরি করা হবে এবং তিনি নিজে এখানে গার্মেন্টস শিল্প স্থাপনের অঙ্গিকার করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেসব দাবি ॥ বরিশাল নগরীর উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি চেয়ে তার সামনে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত বলেছিলেন, বরিশাল নগরী একটি ঘণবসতীপূর্ণ এলাকা। তাই অতিদ্রুত অন্যত্র শহর স্থানান্তর প্রয়োজন। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব নামের এই সিটি প্রকল্প হবে দক্ষিণাঞ্চলের সেরা মেগাসিটি প্রকল্প। ইতোমধ্যে এই প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। মেয়র আরো বলেন, বরিশাল সিটির বর্ধিত এলাকা, নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট অনুন্নত। এসব কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করে মেয়র বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামো সমস্যা, স্বাস্থ্য সেবায় পিছিয়ে থাকাসহ নানা বিষয় তুলে ধরে তা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চেয়েছেন। মেয়র আরো বলেন, আমার নির্বাচনী শ্লোগান ছিলো নতুন বরিশাল গড়ার অঙ্গীকার, জয় হোক শেখ হাসিনার। এই শ্লোগানকে নগরবাসী সাদরে গ্রহণ করেছে। তাই এ শ্লোগান বাস্তবায়নে মেয়র প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
তবে এসব বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দিহান হয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পদ্মা সেতুর টোল আদায় দেড় বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা হলেও এর রক্ষণাবেক্ষণে ইতোমধ্যে খরচ হয়েছে ১৪২ কোটি ১২ লাখ ৮৩ হাজার ২৫ টাকা। এটা সেতু বিভাগের হিসেব। পাশাপাশি আগের তুলনায় ঢাকার উপর তিনগুণ চাপ বেড়েছে। বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, আমি বলবো সরকারের উচিত ঢাকামুখী জনস্রােত থামানো। এজন্য বরিশাল আর খুলনাই নয়; প্রতিটি জেলা শহরে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পরেছে। পাশাপাশি ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা এখন জরুরী হয়ে পরেছে। তবেই পদ্মা সেতুকে ঘিরে স্বপ্ন পূরণের স্বপ্নে বিভোর দক্ষিণাঞ্চলবাসীর স্বপ্ন শতভাগ পূরণ হবে।
বরিশালেও বাঁজবে ট্রেনের হুইসেল ॥ বরিশালেও ট্রেনের হুইসেল বাঁজবে দাবি করে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম বলেছেন, স্বপ্নের পদ্মা সেতু হয়ে বরিশালের সাথে রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমি যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলোচনা করেছি তখন তিনি আমাকে বলেছেন, আগের পরিকল্পনায় কিছু সমস্যা ও ত্রুটি শনাক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে এই অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মাটির অবস্থা এবং সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নে উপযোগী বিকল্প রুট খুঁজছে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বরিশালের সাথে ছয় লেন হাইওয়ে নেটওয়ার্ক সম্পন্ন করার জন্য দ্রুতগতিতে কাজ এগুচ্ছে। আর এটি হবে দক্ষিণবঙ্গের জনগণের অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক উন্নয়ন। তিনি আরও বলেন, রেলওয়ে নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ও ছয় লেন হাইওয়ে নির্মাণের পর উপকূলীয় পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীসহ দক্ষিণাঞ্চলের শতাব্দী প্রাচীণ যোগাযোগ সমস্যার সমাধান হবে।