স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির সাবেক নেতারা আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইসের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন মন্ত্রী। সরকার চাপ দিয়ে বিএনপির সাবেক নেতাদের নির্বাচনে আনছে বলে অভিযোগ রয়েছে- এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখানে চাপের কোনো প্রশ্নই আসে না। এরা স্বপ্রণোদিত হয়ে আসছেন। এরা সবসময় আমাদের নেতাদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। তারা ইলেকশন করবেন, করতে চান। আমাদের কথা একটাই নির্বাচন ডিক্লেয়ার হয়ে গেছে, আপনারা যেভাবে দল ভেঙে নতুন দল করেছেন, সেভাবেও আসুন বা আপনারা যেভাবে আসতে পারেন আসুন। আমাদের তরফ থেকে আপনাদের স্বাগত। নির্বাচন না করার ঘোষণা দেওয়ার দলগুলোকে নির্বাচনে আসতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আহ্বান জানাবেন কি না- এ বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন তো আহ্বান জানিয়েই দিয়েছেন। নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছেন। আমরা তো একটা দল, আমরা তো তাদের আহ্বান করতে পারি না। তারা নিজেরা নির্বাচন কমিশনে যাবেন, তাদের যদি কিছু বলার থাকে বলবেন। সরকারের প্রভাবে মির্জা ফখরুলসহ বিএনপি নেতাদের জামিন দেওয়া হচ্ছে না বলে তাদের আইনজীবী অভিযোগ করেছেন- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেখুন, সরকার প্রভাব বিস্তার করবে কেন? বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। আমাদের সরকারের কোনো প্রভাব সেখানে নেই। কেইস টু কেইস দেখে তারা (বিচারক) জামিন দিচ্ছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এখানে কোনো কিছুতে প্রভাবিত হয়ে বিচারকরা সিদ্ধান্ত দেননি। আমাদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নয় এটা। বিএনপি অভিযোগ করেছে নির্বাচন থেকে তাদের দূরে রাখতে মামলা ও দণ্ড দেওয়া হচ্ছে- এ বিষয়ে আসাদুজ্জামান খান বলেন, আমি যদি এভাবে বলি বিএনপির সিদ্ধান্তটাই তাদের নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারেনি। যার প্রমাণ আমি দেখালাম। তারা আরও দুটি দলে ভাগ হয়ে গেছে। বিএনপি নেতারাই ভাগ করেছেন। একটায় গেছেন তৈমূর আলম খন্দকার আর একটায় শমসের মবিন চৌধুরী। এরা সবাই বিএনপির প্রমিনেন্ট নেতা, তারাই ভাগ হচ্ছেন। এখানে কাউকে জোর করতে হয়নি, তাদের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত দিচ্ছে তাদের মনঃপুত হচ্ছে না। তারা নির্বাচনমুখী সেজন্যই তারা নির্বাচনে চলে আসছেন। তারা তাদের সেন্ট্রাল কমিটির নির্দেশের বাইরে চলে আসছেন। আমাদের দল থেকে তাদের জোর করার কিংবা আহ্বান জানানোর কোনো প্রশ্নই আসে না। এভাবে নির্বাচন হলে কি তা অবাধ সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে, যেটা বিদেশিরা চাচ্ছে- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যদি কেউ ইচ্ছে করে না আসে, তাহলে কি কাউকে জোর করে আনা যাবে? যারা মনে করছেন বাংলাদেশ সঠিক পথে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যেভাবে চলছে সেই অনুযায়ী একটা নির্বাচন অবশ্যম্ভাবী, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদল হতে হবে, তারাই আসছেন। যারা মনে করছেন তারা জোর করে আসবেন, সন্ত্রাস দিয়ে আসবেন, গাড়ি ভাঙচুর করবেন, জ্বালাও-পোড়াও করবেন, মানুষ হত্যা করবেন, তাদের কথা আলাদা। তারা আলাদাই রয়ে গেছেন। যারা এগুলো চান না তারা কিন্তু এরইমধ্যে চলে এসেছেন। ছোট দল বড় দল সবই একাকার হচ্ছে। এদিকে গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে সহিংস ঘটনার পর সারাদেশে গ্রেপ্তার ও মামলার সংখ্যা কমেছে বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। বাসে ও গাড়িতে আগুন দিন দিন বাড়ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দিন দিন বাড়ছে সেটা সঠিক নয়। এখন যেটা হচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীকে করতে হয় না, দেশের জনগণই তাদের ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করছে। এটাই হলো সবচেয়ে বড় জিনিস। দেশের মানুষ এসব অগ্নিসন্ত্রাস, জ্বালাও-পোড়াও পছন্দ করে না। সেজন্য তারা এসব অপরাধীকে ধরে পুলিশে দিচ্ছে। তিনি বলেন, আমার কাছে তথ্য আছে পুলিশ ও জেলখানার পরিসংখ্যান রয়েছে। ২৮ অক্টোবরের আগে সারাদেশে প্রতিদিন দুই হাজারের কাছাকাছি বিভিন্ন অভিযোগে জেলখানায় যেতো, গ্রেপ্তার করা হতো। আবার দুই হাজারের কাছাকাছি রিলিজ হতো। আর ২৮ অক্টোবরের পরে এ সংখ্যা কমে আসছে। এখন গড়ে প্রতিদিন এক হাজার ৮১৬ জন জেলে যাচ্ছে। এর নানাবিধ কারণ হতে পারে। যারা ভুয়া সংবাদ দিচ্ছে যে, আমরা যাকে পাই তাকে ধরছি। সেটি কিন্তু সঠিক নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মামলার ক্ষেত্রে ২৮ অক্টোবরের আগে সারাদেশে প্রতিদিন ৫৬৫টি মামলা হতো। ২৮ অক্টোবরের পরে এখন পর্যন্ত প্রতিদিন ৪৩৮টি মামলা হয়েছে। ১২৭টির মতো মামলা কমেছে। আমি আপনাদের ধারণাটা দিলাম, তারা যে বলছে রাজনৈতিক মামলায় যাকে পাঁচ্ছি বিএনপির নেতাদের ধরছি, মামলা করছি, এটা কিন্তু সঠিক নয়। গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ ডাকে বিএনপি। এ সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংস ঘটনা ঘটে। এরপর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। দেশজুড়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছে দলটি। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি জানতে চেয়েছিলেন, জাতিসংঘসহ অন্য বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তার জন্য আমরা কী পদক্ষেপ নিয়েছি। আমরা বলেছি, জনগণের নিরাপত্তা দেওয়াই আমাদের কাজ। পাশাপাশি, বিদেশি যারা আছেন, তাদের অগ্রাধিকার দিয়েই ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা এ-ও বলেছি, যদি আপনি (গোয়েন লুইস) মনে করেন, আপনার নিরাপত্তা আরও বাড়াতে হবে, তাহলে আমাদের জানালেই বিষয়টি বিবেচনা করবো। মন্ত্রী বলেন, আমরা তাকে বলেছি, বাংলাদেশে নির্বাচন একটি আনন্দঘন পরিবেশে হয়, সবখানে আপনি দেখবেন, যখন থেকে প্রচার-প্রচারণা শুরু হবে, তখন থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে মিছিল দেখতে পারবেন। এটা কেবল বাংলাদেশই নয়, পুরো উপমহাদেশেই এমনটি ঘটছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী সবসময় সজাগ থাকবে, যাতে কেউ কোনো রকম নাশকতা কিংবা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে। বিদেশি কূটনীতিকরা মুক্তভাবে চলাচল করতে পারবে কি না, জানতে চাইলে আমরা বলেছি, যেখানেই যেতে চান, যেতে পারেন। যদি তিনি মনে করেন, সহযোগিতার দরকার আছে, আমরা সেটা করবো। এরপর রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে আমরা যে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়েছি, তাতে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।