দুদকের অভিযানের পরেও গোদাগাড়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দুলাল আলম ও অফিস সহকারি মোঃ আনোয়ার হোসেনের ঘুষবানিজ্য বন্ধ হয় নি। শিক্ষা অফিসার দুলাল আলম নিয়োগ বাণিজ্যের টাকা দিয়ে রাজশাহী সিটির প্রাণকেন্দ্র কলাবাগান বোসপাড়া এলাকায় ২ ইউনিটের বিলাস বহুল রাজকীয় ৪ তলা ভবণ নির্মান করেছেন যার নাম দেয়া হয়েছে লাইলুন ভিলা।
প্রশাসনিক পদসহ কর্মচারী নিয়োগে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা, বেতন বিলে স্বাক্ষর, নিয়োগের পূর্বে শূন্যপদে প্রত্যয়ন, টিউশন ফির টাকা উত্তোলনের জন্য প্রত্যয়ন নিতে হাতিয়ে নেন হাজার হাজার টাকা। নতুনপাঠ্য বইয়ের পরিবহন খরচ বাবদ লক্ষাধিক টাকা আসলেও কোন স্কুলকে টাকা না দিয়ে স্বাক্ষর করে নিচ্ছেন, কেউ স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করলেও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দুলাল আলমের নাম করে হুমর্কী দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অফিসের এমএলএস আবুল হোসেনের নামে নতুন বই প্রদানের জন্য ১৫ হাজার টাকা বরাদ্ধ আসলেও তাকে নাম মাত্র ৩ হাজার টাকা দিয়ে বাকী টাকা আনোয়ার আত্মসাৎ করেছেন। মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের বিশ্বাস্ত হওয়ায় আনোয়ার হোসেন প্রতিদিন দেরী করে অফিসে আসেন সবার আগে চলে যান। কোন কোন দিন অফিসে না এসে পরদিন হাজিয়া খাতায় স্বাক্ষর করেন, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তিনি অনুউপস্থিত থাকেন বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
২০১৯ সালের ৮ জুলাই গোদাগাড়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে যোগদান করেছেন মো. দুলাল আলম। গোদাগাড়ীতে সরকারী নিয়মনীতি ভঙ্গ করে, আওয়ামী লীগ নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সুসম্পর্ক রেখে বীরদাপটে চালিয়ে যাচ্ছে নিয়োগে ঘুষ বানিজ্য। সরকারি বিধিমোতাবেক এক উপজেলায় ৩ বছরের বেশী সময় ধরে কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী থাকার নিয়ম না থাকলেও দুলাল আলমের ক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবে সেটা মানা হচ্ছে না।
শিক্ষা অফিসারের বিশ্বস্ত আনোয়ার হোসেন এখনও শূন্য পদে প্রত্যয়নের জন্য ৫ হাজার টাকা, টিউশনফির প্রত্যয়নের জন্য ২/৪ হাজার টাকা, শিক্ষক কর্মচারীদের মাসিক বিলে কথিত স্বাক্ষর করার জন্য ২০০/৩০০ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষা অফিসার দুলাল আলম ও অফিস সহকারি আনোয়ার নিয়মিত অফিসে না আসা, জাতীয় দিবস পালনে উপস্থিত না থাকা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষকরা অফিসে না পেয়ে ৫/৭মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভ না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে।।
এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হওয়াতে মনমানসিকতা ভালো না থাকায় একটু এলোমেলো হয়। তবে তিনি এসবকে পুঁজি করে অফিস ফাঁকি দিলেও দুলাল আলম ব্যপক অনিয়ম-দুর্নীতি, ঘুষ ও শোকজ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন। প্রতিমাসে শিক্ষক কর্মচারীদের নিকট থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ শিক্ষক-কর্মচারীদের। তার ঘুষ বাণিজ্যে শিক্ষক কর্মচারীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রধান, সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড গঠনের সময় তিনি ৬০ হতে ১ লাখ টাকা, কর্মচারী নিয়োগের জন্য ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে বাধ্য করেন। নিয়োগ পাওয়ার পর ফাইল পাঠাতে প্রধান শিক্ষক, সহকারি প্রধান শিক্ষক পদে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এনটিআরসির শিক্ষক নিয়োগের ফাইল পাঠাতে ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা, নতুন কর্মচারী নিয়োগের পর ফাইল পাঠাতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এখানেই শেষ নয়, শিক্ষকদের উচ্চতর স্কেলের ফাইল পাঠাতে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা, কর্মচারীদের ১/২ হাজার টাকা বাধ্য করে ঘুষ নেয়া হচ্ছে। শূণ্যপদের প্রত্যয়ন নিতে গুনতে হয় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। দুদকের অভিযানের পরেই গত ২১/১৯/২০২৩ ইং শনিবার উপজেলার ললিত নগর আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ে ৩ জন কর্মচারী নিয়োগে ২৪ লাখ টাকা নিয়োগ বানিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। দুলাল ও আনোয়ার ঘুষ নিয়েছেন ৯৫ হাজার টাকা একই দিনে মান্ডল উচ্চবিদ্যালয় ও
চাঁদলাই ভুসনা মাদ্রাসা ৬ জন কর্মচারী নিয়োগে মোটা অঙ্কের ঘুষ বানিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
গত ২০ অক্টোবর রাজাবাড়ী হাট বলিকা উচ্চবিদ্যালয় ৪ জন কর্মচারী নিয়োগে ৩৫ লাখ টাকা নিয়োগ বানিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক। শিক্ষা অফিসার ও আনোয়ার ঘুষ নিয়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারির আনোয়ারের দাপটে শিক্ষকরা একরকম অসহায় হয়ে পড়েছে। ঘুষের টাকা ছাড়া কোন ফাইল নড়াচড়া করে না। এ ঘুষের টাকা না দিতে চাইলে অফিস সহকারি আনোয়ার শোকজ নোটিশ লিখে শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর করে ধরিয়ে দিয়ে হাতিয়ে নেন হাজার হাজার টাকা।
অফিস সহকারি আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমি স্যারের নির্দেশনায় এসব টাকা নিয়ে থাকি। স্যার নিজেই যার কাছে যেমন পারে তেমন ভাবে এসব টাকা পয়সা নেন। যখন মিটিং এ থাকে তখন আমাকে নিতে বলেন। এসব টাকা নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও এসব টাকা নেওয়া একরকম নিয়ম হয়ে গেছে। শুধু এই স্যার না এর আগেও যারা ছিলেন তারাও নিয়েছে। এছাড়াও আয়া নিয়োগে ঊর্ধ্বতন মহল ৮/১০ লাখ টাকা নেন।
এনটিআরসি থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত লস্করহাটি উচ্চবিদ্যালয়ের এক সহকারি শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমার বেতনের জন্য শিক্ষা অফিসার দুলাল আলম প্রথমে ৫ হাজার টাকা চেয়েছিলো। পরে বকেয়া বেতনের জন্য আরও ৪ হাজার টাকা নিয়েছে। আমাদের স্কুলের ৮ জন আবেদন করেছিলো মোট ১৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। টাকা ছাড়া তিনি কাজই করেন না। উপজেলায় যতগুলো স্কুলের শিক্ষক আবেদন করেছিলো সবার কাছে তিনি টাকা নিয়েছেন। একবার তিন মাসের বেতন বকেয়া ছিলো সেটির আবেদন করলে পুনরায় টাকা নিয়েছেন বলে জানান।
হুজরাপুর উচ্চবিদ্যালয়ের এক সহকারি শিক্ষক কবিরুল ইসলাম বলেন, আমার স্কুলের ৭ শিক্ষকের উচ্চতর স্কেলের জন্য ১৪ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন আনোয়ার। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রেখে ঘুরান। তাই হয়রানি হতে বাঁচতে বাধ্য টাকা দিতে হয়েছে।
এবিষয়ে গোদাগাড়ী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দুলাল আলমের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোনকলটি বারবার কেটে দেওয়ায় বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।