বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজছাত্রী নিবাসের আবাসিক ছাত্রীদের নিয়ে গঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলেও র্যাগিংয়ের শিকার তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্ছিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পাশাপাশি কলেজের সুষ্ঠ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ও সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারী অধ্যক্ষসহ অন্যান্যের দ্রুত অপসারণের দাবিতে সাংবাদিক সমাজের সাথে ফুঁসে উঠেছেন বরিশালবাসী। একইসাথে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাঁধা প্রদান করে তাদের ওপর হামলার ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব,) জাহিদ ফারুক শামীম।
রোববার সকালে র্যাগিংয়ের শিকার তৃতীয় বর্ষের ওই ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, বেশ কয়েকদিন থেকে কথিত ছাত্রলীগ নেত্রী পরিচয় দিয়ে পঞ্চম বর্ষের ছাত্রী নীলিমা হোসেন জুঁই ও ফাহমিদা রওশন প্রভা তাকে এবং তার রুম মেটকে নানাভাবে গালিগালাজসহ মানসিক নির্যাতন করে আসছেন। এতে তারা ভীতসন্ত্রস্ত ছিলেন। তাদের সাথে যেন এ ধরনের আচরণ করা না হয়, সেজন্য নেতৃত্ব দেওয়া ওই ছাত্রীদের একজন সহপাঠীকে দিয়ে তারা অনুরোধ করান। এতে অভিযুক্তরা চরমভাবে ক্ষুব্দ হন। এরজের ধরে গত ২৩ আগস্ট দিবাগত রাত ১১টার দিকে নির্যাতনের শিকার ওই ছাত্রী ও তার রুম মেটকে হলের ৬০৬ নম্বর কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর তাদের দুজনকে দাঁড় করিয়ে অভিযুক্তদের সহপাঠীর কাছে কেন নালিশ করা হয়েছে, এজন্য কৈফিয়ত চান এবং অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে তল্লাশি করা হয়। এভাবে প্রায় আধা ঘণ্টা নানাভাবে শ্বাসিয়ে দুই ছাত্রীকে তাদের কক্ষে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কক্ষে ফিরে ভীতসন্ত্রস্ত এক ছাত্রী বিষয়টি অভিযুক্তদের ওই সহপাঠীকে পূর্ণরায় জানায়। ফলে ভূক্তভোগী ওই ছাত্রীকে দ্বিতীয়বারের মতো আবারও ডেকে নেওয়া হয়।
র্যাগিংয়ের শিকার ছাত্রী আরও বলেন, রাত ১২টার দিকে দ্বিতীয় দফায় ডেকে নিয়ে প্রায় দুই ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রেখে আবারও গালিগালাজ করে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। এ সময় ওই ছাত্রী কান্নাকাটি করে অসুস্থতার কথা জানিয়ে তাকে বসার অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তাকে বসতে না দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। তার মোবাইল ফোন পূর্ণরায় কেড়ে নিয়ে তল্লাশি করা হয়। দুই ঘন্টা ধরে এভাবে মানসিক নির্যাতনে ওই ছাত্রী অসুস্থবোধ করলে তাকে কক্ষে পাঠানো হয়। এরপর পরই সে অচেতন হয়ে পরেন। পরে গভীর রাতে তাকে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
র্যাগিংয়ের শিকার ওই ছাত্রীর মা বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে তিনি তার মেয়েকে নিয়ে ঘটনার বিচার দাবি করে শনিবার (২৬ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে কলেজের অধ্যক্ষের কাছে যান। এ সময় কলেজ প্রশাসন তার মেয়ে ও অন্য এক ছাত্রীকে ডেকে ঘটনা সম্পর্কে তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। পরে প্রশাসন তার মেয়েকে মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর কথা জানায়। ওই ছাত্রীর মা অভিযোগ করেন, নির্যাতনের শিকার দুই ছাত্রীকে কলেজ প্রশাসন থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, তোমরা চিকিৎসা চাও, নাকি বিচার চাও? যেকোনো একটি বেঁছে নিতে হবে। বিচার চাইলে তোমাদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নির্যাতনকারী ছাত্রীদের পক্ষে যায়, এমন প্রস্তাব কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসায় আমরা বিস্মিত হয়েছি।
নির্যাতনের শিকার ছাত্রীর মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কলেজ প্রশাসন এখন আমার নির্যাতিতা মেয়েকে মানসিক ভারসাম্যহীন প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি কলেজ প্রশাসন যখন দুই ছাত্রীর বক্তব্য নিচ্ছিল, নির্যাতনকারীরা তখন বাইরে অবস্থান নিয়ে হাসাহাসি করছিল। কলেজ প্রশাসনের এমন আচরণে আমরা হতাশ হয়েছি। বর্তমানে মেয়ের নিরাপত্তা নিয়েও আমি চরম উদ্বিগ্ন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রী নিবাস ব্যবস্থাপনা কমিটি মূলত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়েই করা হয়ে থাকে। পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী নীলিমা হোসেন জুঁই সেই কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক। ফাহমিদা রওশন প্রভা তার (জুঁই) ঘনিষ্ঠ সহযোগি।
অভিযোগ সম্পর্কে পঞ্চম বর্ষের ছাত্রী নীলিমা হোসেন জুঁই বলেন, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। এ বিষয় নিয়ে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থা আমার নেই। কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. জিএম নাজিমুল হক বলেন, ছাত্রী নিবাসে কোন র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটেনি। একটি কক্ষে তিন ছাত্রীর মধ্যে একটু দ্বন্ধ হয়। তাই একপক্ষ ছাত্রী নিবাসের ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে বিচার দেয়। ব্যবস্থাপনা কমিটি বিচার করায় একজন ক্ষুদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। উপাধ্যক্ষ আরো বলেন, ব্যবস্থাপনা কমিটির বিচার করার কোন এখতিয়ার নেই। তাই শনিবার রাতে তাদের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রী নিবাসের আবাসিক ছাত্রীদের কক্ষের রদবদল করা হবে। তিনি আরো বলেন, অধ্যক্ষ ডা. ফয়জুল বাশার সকল শিক্ষার্থীদের হলে শান্তিপূর্ন অবস্থান করার নির্দেশনা দিয়েছেন। ভবিষ্যতে কেউ ঝামেলা করলে কিংবা শান্তিপূর্ন পরিবেশ নষ্ট করলে একাডেমিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও অধ্যক্ষ জানিয়ে দিয়েছেন।
সূত্রমতে, র্যাগিংয়ের শিকার তৃতীয় বর্ষের ওই ছাত্রীর মায়ের বক্তব্যের পর সাতজন সাংবাদিক নির্যাতিতা ছাত্রীর বক্তব্য গ্রহণের সময় শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. ফয়জুল বাশারের নেতৃত্বে কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক ডা. সৈয়দ বাকী বিল্লাহ, প্যাথলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সাহাসহ কয়েকজন শিক্ষক ও অফিস সহকারী মিলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় অধ্যক্ষ কলেজের শিক্ষার্থীদের নানাধরনের উস্কানি দিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালাতে বলেন। হামলায় সাতজন সাংবাদিক আহতসহ তাদের ব্যবহৃত ক্যামেরা ও ট্রাইপড ভাঙচুর করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ওইদিন বিকেলে নাটকীয় সমঝোতা করে অধ্যক্ষসহ অন্যান্য হামলাকারীরা কয়েকজন সাংবাদিকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি হামলার শিকার সংবাদকর্মীসহ অন্যান্য সাংবাদিকরা।
সাংবাদিকদের দাবি আদায়ে দেশব্যাপী কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) প্রতিষ্ঠাতা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর এক বিবৃতিতে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজের সুষ্ঠ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ও সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারী অধ্যক্ষসহ অন্যান্যের দ্রুত অপসারণের দাবি করেন। পাশাপাশি হামলাকারীদের দ্রুত শাস্তির দাবি করেন।
অপরদিকে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাঁধা প্রদান করে তাদের উপর হামলার ঘটনার দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিক ফিরোজ মোস্তফা, মুশফিক সৌরভ, শাকিল মাহমুদ, সুমন হাসান, কাওছার হোসেন রানা, রুহুল আমিন ও আজিম শরীফের ওপর শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের হামলার বিষয়টি দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণমাধ্যমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। সেখানে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাঁধা প্রদান করা কোনভাবেই ঠিক হয়নি। এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে সকল জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।