অনগ্রসর মানুষের স্বল্প ব্যয়ে পুষ্টির ভাল যোগানদাতা মিষ্টি আলু। এ খাবার সাধারনের জন্য সারাদিনের পুষ্টির যোগান দিয়ে থাকে। বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে এবার অধিক ক্যালরি উৎপন্নকারী মিষ্টি আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। সবমিলিয়ে এবার মিষ্টি আলু উৎপাদন হয়েছে প্রায় পৌনে তিন লাখ টন।
কৃষি এবং পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, হলুদ ও রঙ্গিন শাঁসযুক্ত মাত্র ১৩ গ্রাম মিষ্টি আলু একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের প্রতিদিনের ভিটামিন-এ’র চাহিদা পূরণে সক্ষম। যা শিশুদের রাতকানা রোগসহ যেকোন বয়সের মানুষের দৃষ্টিশক্তি স্বল্পতার আশঙ্কা থেকেও নিরাপদ রাখতে সহায়ক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ডিএই’র দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, বিগত রবি মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে পৌনে তিন লাখ টন মিষ্টি আলু উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। সূত্রে আরও জানা গেছে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার হেক্টরে আট থেকে ১০ লাখ টন মিষ্টি আলু উৎপাদন হয়ে। যার প্রায় এক তৃতীয়াংশই বরিশাল কৃষি অঞ্চলে আবাদ ও উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে উচ্চ ফলনশীল বীজসহ মাঠ পর্যায়ে উন্নত আবাদ প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে পারলে দক্ষিণাঞ্চলে মিষ্টি আলুর উৎপাদন প্রায় দ্বিগুনে উন্নীত করা সম্ভব বলেও মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবিদরা।
সূত্রমতে, দীর্ঘকাল থেকে বরিশালের চরাঞ্চলে মিষ্টি আলুর আবাদ হয়ে আসছে। কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট বারি’র বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে অন্তত ১০টি উচ্চফনশীল ও পুষ্টি সমৃদ্ধ মিষ্টি আলুর উন্নতজাত উদ্ভাবন করেছেন। যার উৎপাদনও সনাতন জাতগুলোর চেয়ে প্রায় তিন থেকে চারগুন বেশি। এমনকি এসব মিষ্টি আলু থেকে জেলি, জ্যাম, মিষ্টি, চিপস, হালুয়া ছাড়াও পুষ্টি সমৃদ্ধ ও উন্নত মানের শস তৈরী করা সম্ভব।
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিষ্টি আলুর দেশীজাতগুলো থেকে হেক্টর প্রতি ১০ টনের মত উৎপাদন সম্ভব হলেও ‘বারি’ উদ্ভাবিত ‘বারি মিষ্টিআলু-১ (তৃপ্তি), বারি মিষ্টিআলু-২ (কমলা), বারি মিষ্টিআলু-৩ (দৌলতপুরী), বারি মিষ্টিআলু-৪, বারি মিষ্টিআলু-৫, বারি মিষ্টিআলু-৬, বারি মিষ্টিআলু-৭, বারি মিষ্টি আলু-৮ ও বারি-মিষ্টি আলু-৯’ জাতগুলোর হেক্টর প্রতি উৎপাদন প্রায় ৪০ টন পর্যন্ত। বরিশাল কৃষি অঞ্চলে এবার হেক্টর প্রতি ২০ থেকে ২৩ টন মিষ্টি আলুর উৎপাদন হয়েছে।
কৃষিবিদ মামুনুর রহমান বলেন, উৎপাদনের দিক থেকে দেশে খাদ্য ফসলের মধ্যে মিষ্টি আলুর অবস্থান এখন চতুর্থ। তবে সুদূর অতীতকাল থেকে জনপ্রিয় এ খাদ্যফসলের বহুমুখী ব্যবহার এখনো সম্প্রসারণ ঘটেনি। এমনকি উৎপাদন এলাকার বাইরেও এ ফসলের তেমন প্রচলন নেই। এমনকি ‘বারি’ উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল মিষ্টি আলুর আবাদ কৃষক পর্যায়ে পরিপূর্ণভাবে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি ‘বারি’ উদ্ভাবিত এসব উন্নতজাতের মিষ্টি আলুর জাতের লতা বা বীজগাছসহ আবাদ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট মাঠ কর্মীদের খুব একটা আগ্রহী ভূমিকা নেই। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যে পরিমান জমিতে সনাতন জাতের মিষ্টি আলুর আবাদ হচ্ছে, সেখানে উন্নত প্রযুক্তিতে উচ্চ ফলনশীল মিষ্টি আলুর আবাদ নিশ্চিত করতে পারলে এ অঞ্চলেই উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান বলেন, দোআঁশ ও বেলে মাটি মিষ্টি আলু আবাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পরিমিত পরিমাণ গোবর সার ছাড়াও টিএসপি, ইউরিয়া ও এমপি সার প্রয়োগের মাধ্যমে মিষ্টি আলুর অত্যন্ত ভাল ফলন পাওয়া যায়। জমির আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনে ২-৩ বার সেচ প্রদান করতে হয়। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে চরাঞ্চলের বেলে দোআঁশ মাটি মিষ্টি আলু আবাদের অনুকূল। তবে চরাঞ্চলে নভেম্বরের শেষভাগ পর্যন্ত এ আলুর আবাদ সম্ভব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মার্চ মাসের শেষ থেকেই বাজারে নতুন মিষ্টি আলু উঠতে শুরু করেছে। মে, জুন পেরিয়ে জুলাই মাসেও বরিশালের বাজারে এখনো বিক্রি হচ্ছে মিষ্টি আলু। মৌসুমে প্রতি কেজি খুচরামূল্যে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে মিষ্টি আলু বিক্রি করা হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকরা গড়ে ১৫ টাকার বেশী দাম পায়নি। গোল আলুর চেয়ে মিষ্টি আলুতে কৃষকরা বাজারে ভাল দাম পেলেও এখনো লতা ও বীজ সংকটের কারণে দক্ষিণাঞ্চলে এ অর্থকরি ফসল আবাদে প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।