রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) ইতিহাসে মেয়র পদে সবচেয়ে কম ও দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছাড়াও কম ভোটার উপস্থিতি নিয়েই শেষ হয়েছে ৬তম নির্বাচন। বুধবার (২১ জুন) সকাল ৮টা থেকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিরতিহীনভাবে চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা কেন্দ্রে প্রবেশ করেছিলেন তারা ৪টার পরও ভোটপ্রয়োগের সুযোগ পান। ভোটগ্রহণ শেষে এখন চলছে গণনার কাজ। তবে নির্বাচন বয়কট করলেও এখন পর্যন্ত ভোট গনণার প্রাপ্ত ফলাফলে নৌকার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখার মেয়র প্রার্থী মাওলানা মুরশিদ আলম ফারুকী।
এ প্রতিবেদন সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় লেখা অবস্থায় মোট ১৫৫ কেন্দ্রের মধ্যে প্রাপ্ত ৪৬ কেন্দ্রের ফলাফলে আওয়ামী লীগ মনোনীত ও ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৬৭৬ ভোট, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মুরশিদ আলম (হাতপাখা প্রতীক) পেয়েছেন ৩ হাজার ৪৫৭ ভোট, জাকের পার্টির মো. লতিফ আনোয়ার (গোলাপফুল প্রতীক) ৩ হাজার ২২০ ও জাতীয় পার্টির মো. সাইফুল ইসলাম স্বপন (লাঙল প্রতীক) পেয়েছেন ২ হাজার ৪১৯ ভোট।
এদিকে প্রথমবারের মতো এবারের রাসিক নির্বাচন ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। এ নির্বাচনে বড় ধরণের কোনো অনিয়মের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভোট গনণা চলাকালীন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইনস্ট্রিটিউট অফ হেলথ টেকনোলটি (আইএইচটি) কেন্দ্রের বাইরে বর্তমান কাউন্সিলর পাশ করে গেছেন এমন একটি গুজবে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।
এর আগে নির্বাচন চলাকালে মহানগরীর ৪ নম্বর ওয়াডের্র কেশবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে দুপুর ১টার দিকে বর্তমান কাউন্সিলর ও চলতি নির্বাচনের প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের ওপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে একপক্ষ আরেক পক্ষের নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুর করেছেন। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন।
এছাড়াও ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের ১৪১ নম্বর কেন্দ্রের (তালাইমারী দারুল উলুম আলিম মাদ্রাসা) গোপন ভোটকক্ষে একাধিকবার প্রবেশের দায়ে মোসা. সাবিয়া নামের এক নারীকে তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনারগণ সিসিটিভি মনিটরের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রিসাইডিং অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে অবগত করলে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে তাকে কারাদণ্ডাদেশ দেন।
এদিকে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) বিশ্বাস করে কেন্দ্রে কোনো পোলিং এজেন্ট দেননি বলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন জাকের পার্টির গোলাপ ফুল প্রতীকের মেয়র প্রার্থী লতিফ আনোয়ার। তিনি বলেন, ফল যাই হোক, তা মেনে নেব। তার আগে দুপুর ১২টার দিকে তিনি মহানগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের হেতমখাঁ গোরস্থান এলাকায় থাকা মুসলিম হাই স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেন। এর আগে সকাল সোয়া ৯টার দিকে মহানগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের উপশহর এলাকার স্যাটেলাইট টাউন হাইস্কুল কেন্দ্রের ১ নম্বর কক্ষে নিজের মূল্যবান ভোট দেন নৌকার প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন।
এবারের রাসিক নির্বাচনে মেয়র পদে চারজন প্রার্থীর মধ্যে মূলত দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। কারণ, বরিশাল সিটি নির্বাচন ইস্যুতে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী হাফেজ মাওলানা মুরশিদ আলম ফারুকী আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন থেকে অনেক আগেই সংবাদ সম্মেলন করে সরে দাঁড়ান। আর জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতিক নিয়ে সাইফুল ইসলাম স্বপন প্রতিদ্বন্দ্বীতায় থাকলেও তিনিও দলটির কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সার্পোট না পাওয়ায় প্রকৃত ভোট যুদ্ধে মাঠে ছিলনা। এ বিষয়ে গত কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন গনমাধ্যমে সাইফুল ইসলাম স্বপনের সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে লাঙ্গলের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপন গত সোমবার (১৯ জুন) দুপুরে মুঠোফোনে কৌঁসুলি আলাপকালে প্রতিবেদককে বলেছিলেন, বিভিন্ন কারণে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারছেন না। ফলে মেয়র পদে এবার ভোটের মাঠে ছিলেন- আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাসিকের সদ্য সাবেক হওয়া মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এবং জাকের পার্টির গোলাপ ফুল প্রতীকে লতিফ আনোয়ার। তবে শুরু থেকেই নির্বাচনী মাঠ দখলে রেখেছিলেন নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী লিটন। ফলে তৃতীয়বারের মত পুনরায় নগরপিতার আসনে বসতে যাচ্ছেন নৌকার মেয়র প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটন।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাসিক নির্বাচনে ১৫৫ টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৪৮টি ঝঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) ও ৭টিকে সাধারণ ভোট কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নত করা হয়েছিল। সিটির ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৪৬ জন নারী কাউন্সিলর প্রার্থী আর ৩০টি সাধারণ ওয়ার্ডে ১১২ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। এই সিটির ৩০ ওয়ার্ডের মধ্যে ৫টি ওয়ার্ডে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ৪ জন করে, ১টি ওয়ার্ডে ৩ জন ও বাকি ১৩টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের ২ জন করে কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ছিলেন। এ ছাড়া সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরসহ ১৬টি ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা নির্বাচন করেন। এখন শুধু ফলাফলের অপেক্ষা।
এর আগে নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, র্যাব ও আনসার সদস্যবৃন্দ দায়িত্ব পালন করছে। নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
জানা গেছে, আজ থেকে ৪৭ বছর আগে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পথ চলার ইতিহাস শুরু হয়। ১৮৭৬ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহী পৌরসভা (রামপুর-বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটি) কার্যক্রম শুরু করে। ওই সময় মিউনিসিপ্যাল এলাকার আয়তন ছিল ৬ দশমিক ৬৪ বর্গ মাইল। সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার এর আয়তন ও জনসংখ্যা বেড়ে যায়। বর্তমানে রাজশাহী মহানগর এলাকার আয়তন ৯৬ দশমিক ৭২ বর্গ মাইল। ১৯৯৪ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশনে প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর আজ অর্থাৎ ২০২৩ সালের ২১ জুন হলো ষষ্ঠ নির্বাচন।