ছুটির ঘণ্টা পড়ে গেলেই শিক্ষার্থীদের মুখ ভার সাধারণত প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলিতে ছুটির ঘন্টা পড়লে শিক্ষার্থীদের মুখে আনন্দ পেতে দেখা যায়। হৈ-হুল্লোড়ে দৌড়ে কে কার আগে বিদ্যালয় থেকে বের হতে পারে কচিকাঁচাদের থাকে সেই প্রতিযোগিতা। তবে খুলনার কয়রা উপজেলার হড্ডা ডি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি যেন ব্যতিক্রম। ছুটি হলেও স্কুল ছেড়ে ফিরতেই চায় না শিক্ষার্থীরা। ছুটির ঘণ্টা পড়ে গেলেই শিক্ষার্থীদের মুখ ভার হয়ে যায়। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখার জন্য জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২২ প্রতিযোগিতায় খুলনা জেলায় শ্রেষ্ঠ ঝরে পড়ার হার কমাতে সক্ষম বিদ্যালয় হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে বিদ্যালয়টি। গত ৬ সেপ্টেম্বর খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. তৌহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে এটি প্রকাশ করা হয়।
খুলনা শহর থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের সুন্দরবন লাগোয়া দরিদ্র পিড়িত গ্রামটির নাম হড্ডা। ওই গ্রামের অধিকাংশ মানুষই সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজীবী।একেবারেই অজপাড়াগাঁয়ের একটি বিদ্যালয়ের এমন সাফল্যে বিদ্যালয়টি এখন শিক্ষানুরাগীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হড্ডা ডি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অরুন কুমার সানা জানান, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের আনন্দঘন পরিবেশের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছুটির পরেও বাড়ি যেতে চায়না। শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা করেন তারা। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আরও জানান, উপকূলের এই জনপদে প্রাকৃতিক নানা বৈরী পরিবেশের সাথে মিলেমিশে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। প্রতি বছর ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগের তুলনায় এই কয়েক বছর বন্যাও হয়েছে বেশ কয়েকবার। ফসলি জমিসহ মৎস্য চাষিরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেয়ে স্থানীয় বনজীবী পরিবারগুলো শিশু সন্তনদেরকেও সুন্দরবনে নিয়ে যেয়ে কায়িক পরিশ্রম করায়। মূলত এসব কারণে অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় এই অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। সুন্দরবনের পাশে প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে ঝরে পড়া এবং বিদ্যালয়বিমুখ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সচেতন করে শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এলাকার সমাজ সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে উল্লেখ করে প্রধান শিক্ষক জানান, এখন সকলের উৎসাহে প্রতিদিন স্কুলে আসা শিক্ষার্থীদের কাছে নেশার মতো।
গত বুধবার সকাল সাড়ে নয়টায় সরেজমিনে দেখা যায়, অসাধারণ, সাদামাটা একটি গ্রাম হড্ডা। যেখানে সকাল থেকেই জীবনযুদ্ধ শুরু হয় খেটে খাওয়া মানুষের। সেখানে হড্ডা ডি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুন্দর এবং মনোরম পরিবেশে শিক্ষা লাভ করছে শিক্ষার্থীরা। কিছু শিশুরা মনের আনন্দে খেলা করছে বিদ্যালয়ের নিচের ফাকা জায়গায়। বিদ্যালয়টির ভেতরের দৃশ্যও নান্দনিক। দেয়ালে দেয়ালে আঁকা রয়েছে স্বাধীনতার মহান পুরুষ ও শহীদের প্রতিকৃতি, কবি-সাহিত্যিক, বাঘ, ভালুক, ময়ূর, চিত্রা হরিণ, খরগোশ, হাতি, বক, কুমিরসহ বিভিন্ন প্রাাণীর ছবি। তা ছাড়া শিশুদের জন্য বিভিন্ন খেলনাসামগ্রী দিয়েও শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। এই বিদ্যালয়ে শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এর মধ্যে সুশাসন ও শুদ্ধাচার সততা ষ্টোর, রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কর্ণার, মানবতার দেয়ালও উল্লেখযোগ্য। প্রতিটা শ্রেনী কক্ষে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে পাঠদান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৬ জন। রয়েছে পাঁচজন শিক্ষক-শিক্ষিকা। বিদ্যালয়ের নিজ উদ্যোগে অভিভাবকদের সহোযোগিতায় শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে দুপরের খাবার( মিড ডে মিল)। হড্ডা ডি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ঝুম্পা মন্ডল জানান, একটা সময় এলাকায় অভাব-অনটনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে খুব একটা হাজির হতো না। বিষয়টি নিয়ে ভাবনায় পড়লেন। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং ঝরে পড়া রোধে নিজেই উদ্যোগ নিলেন। এরপর বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও অভিভাবকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা ডাকলেন। পড়ালেখায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানালেন তাদের। তার পরিকল্পনায় সবাই সম্মতি দিলেন। গ্রামের লোকজনকে নিয়ে দরিদ্র এই এলাকার স্কুলে মিড ডে মিল চালু করলেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মহশিষ সরদার জানান, মিড ডে মিল চালু করায় স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বেড়েছে। তা ছাড়া পরিবেশ ভাল রাখার জন্য এলাকার মানুষ সব সময় আন্তরিক। বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সেঁজুতি ঢালী বললো, স্কুলে দুপুরের খাবার না পেলে আমার হয়তো স্কুলেই আসা হতো না। স্কুলের খাবার সবাই একসাথে খাই। বাড়ির চেয়ে স্কুলের খাবার ভালো লাগে। হড্ডা ডি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা চায়না সরকার বলেন, আমরা বাচ্চাদের বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ দিয়ে পাঠদান দেই, ফলে তারা পাঠে আনন্দ পায় এবং মনোযোগী হয়। সর্বোপরি বাচ্চাদের রেজাল্ট অনেক ভালো। কয়রা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, হড্ডা ডি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কয়রা উপজেলার অন্যতম একটি বিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য সৃজনশীল অনেক কিছু জিনিস আছে যা শিক্ষার্থীদের মনকে দোলা দেয়। বিদ্যালয়টি দিন দিন উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হচ্ছে। আশাকরি বিদ্যালয়টি এক দিন জাতীয় পর্যায়ে নাম করবে। কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রোকনুজ্জামান বলেন, কয়রার হড্ডা ডি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে একটি আদর্শ মডেল। বিদ্যালয়টির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যে সকল ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। বিদ্যালয়ের এ ধরনের সাফল্য ধরে রাখার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।