মোংলা ও সুন্দরবনের কোলঘেষা বানিশান্তা ইউনিয়ন। এলাকাটি খুলনার দাকোপ উপজেলার আওতাধীন। নিবৃত এ পল্লী এলাকার পূর্ব ঢাংমারী গ্রামের খ্রিস্টান পাড়ার বাসিন্দা নজরুল হাওলাদার। তিনি সুন্দরবনের ওপরই নির্ভরশীল। নদীতে মাছ ধরেই জীবীকা চলে তার পরিবারের।
নজরুল হাওলাদারের ৩ ছেলের মধ্যে রাজু হাওলাদার (২২) ছোট। সে মোংলার বাজুয়া এসএন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকার মিরপুর বাংলা কলেজে অনার্সে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছুই চলছিল স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু হঠাৎ করে মাথায় যেণ আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে এ জেলে পরিবারটির। কারণ বাড়ি লাগোয়া সুন্দরবনের খালে গোসল করতে নেমে কুমিরের লড়াই হয়েছে কলেজ ছাত্র রাজুর। তবে প্রাণে বেঁচে আছেন রাজু। কিন্তু তার ডান পায়ের উরুতে কুমিরের ধারালো দাঁতের ৪টি আঁচড় স্পষ্ঠ। এ ক্ষত এখন রাজুকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ঘটনা মনে করতেই ভয়ে আতকে উঠছেন কলেজ ছাত্র রাজু।
বুধবার বিকেলে রাজু’র বাড়িতে গেলে কুমিরের আক্রমণ থেকে ফিরে আসার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয় সে। রাজু জানায়, সে সোমবার দুপুর ২টার দিকে নিজ বাড়ি লাগোয়া সুন্দরবনের ঢাংমারী খালে গোসল করতে নামে। একপর্যায়ে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে মাথায় শ্যাম্পু মাখছিলেন তিনি। এরইমধ্যে হঠাৎ করে কয়েক সেকেন্টের মধ্যে একটি কুমির তাকে আক্রমণ করে। কুমিরটি রাজুর ডান পায়ের হাঁটুর ওপরের দিকে কামড়ে ধরে প্রায় ১৫-১৬ হাত পানির গভীরে টেনে নিয়ে যায়। তখন সে কুমিরটির পেটের তলায়। এ সময় হঠাৎ তার স্মরণ হওয়ায় জীবন বাঁচাতে কুমিরের চোখে আঙুল ঢুকিয়ে সজোরে আঘাত করেন। চোখে আঘাত পেয়ে কুমিরটি রাজুকে ছেড়ে দেয়। তখন তিনি দ্রুত নদীর উঠে মা-বাবা বলে চিৎকার করেন। এ সময় খালের পানি তার রক্তে লাল হয়ে যায়। তাৎক্ষনিক তার মা-বাবা পাড়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ না। রাজু পাড়ে উঠার কয়েক সেকেন্টের মধ্যে কুমিরটিও তাকে ধরতে তাড়া করে খালের পাড়ে জেগে ওঠে। কিন্তু লোকজনের শব্দ পেয়ে খালে ডুব দিয়ে চলে যায়। কুমিরের কামড়ে রাজুর পায়ের ক্ষত জায়গায় চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তিনি এখন অনেকটা সুস্থ হয়ে বাড়িতে অবস্থান করছেন।
রাজুর পিতা নজরুল হাওলাদার, মা মরিয়ম বেগম এবং বড় ভাই মনির হাওলাদার ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তারাসহ গ্রামের অধিকাংশ লোকজন ঢাংমারী খালে নেমে মাছ ধরা ও গোছলসহ বিভিন্ন কাজে নামে। কিন্তু কুমির কাউকে আক্রমণ করেনি। তবে হাস-মুরগি ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু রাজুকে আক্রমণ করবে এটা কেউ ভাবতে পারেননি।
তবে রাজু বেঁচে ফেরায় তারা সন্তোষ প্রকাশ করলেও তার চিকিৎসার অর্থ যোগান নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বাড়ির একটি ছাগল বিক্রি করে তার চিকিৎসা চলছে। কিন্তু বন বিভাগের পক্ষ থেকে বা কোন জনপ্রতিনিধি তাদের সহায়তায় এগেয়ি আসেনি। এ বিষয়ে দরিদ্র এ পরিবারের পক্ষে সহায়তার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তারা।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের (মোংলা) ঢাংমারী স্টেশন কর্মকর্তা মো: সাইফুল বারী বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাংমারী খালে প্রায় সময়ই বড় বড় দুইটি কুমির দেখা যায়। তাই বনবিভাগের পক্ষ থেকে খালের পাড়ের আশপাশের মানুষদের খালে নামতে প্রতিনিয়ত নিষেধ করা হচ্ছে। তারপরও তারা তা না শুনে খালে গোসল ও মাছ ধরতে নামেন। ফলে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে।