প্রজনন মৌসুমে সাগরে গত ২০ মে থেকে মাছ ধরা বন্ধের ঘোষণা দেয় মৎস্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে নদী খাল থেকে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সকল প্রকার মাছ ধরা বন্ধ রাখতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বন বিভাগ। শুধু মাছ ধরা নয় পর্যটক প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সুন্দরবনে ফলে ওই সময় থেকেই সুন্দরবনে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার প্রায় ১ লক্ষ জেলে পরিবার। তারপরেও রয়েছে এর সাথে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্তা আরও হাজার হাজার পরিবার। এ সকল পরিবারের মাঝে এ বছর ছিলনা পবিত্র ঈদুল আযহার আনন্দ। অনেক পরিবারে নিরানন্দ কেটে গেছে ঈদ। মে মাস থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন মাস মাছ ধরতে পারছে না জেলেরা। এত লম্বা সময় আয়ের পথ বন্ধ থাকায় তাঁদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। বিকল্প কোন কর্মসংস্থা না থাকায় জেলে পরিবারে লেগেই আছে হাহাকার। এজন্য তারা বন বিভাাগের মাধ্যমে সাহায়্যর দাবি জানিয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানস এর (আইআরএমপি) সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৯ সালে এ সিদ্ধান্ত নেয় বন বিভাগ। সুন্দরবনে জুলাই-আগস্ট দুই মাস মৎস্য প্রজনন ঘটে থাকে। এ বিভাগে অন্তত ৫ লাখ মানুষ সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নির্ভরশীল। কয়রার স্থানীয় জেলে আছাদুল গাজি বলেন, বছরের সাড়ে তিন-চার মাস সরকারি ভাবে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝড় বন্যা জলোচ্ছাসের কারণে মার্চ ও মে মাস বন্ধ রাখতে হয়। সব মিলিয়ে ৬ মাস মাছ ধরতে পারে জেলেরা। বাকি ৬ মাস বসে বসে কাটাতে হয়। সরকারি কোন সহায়তাও আমরা পাই না। পরিবার চালানো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ তিন মাস ধরে মাছ ধরা বন্ধ, অন্যদিকে এলাকায় নেই তেমন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে চরম বিপাকে পড়েছে সুন্দরবন নির্ভরশীল জেলেরা। তাদের অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। শিগগিরই সুন্দরবনে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান জেলেরা। পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের ৩ হাজার ১০০ বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেটধারী (বিএলসি) জেলে রয়েছে। আর সাতক্ষীরা রেঞ্জে রয়েছে ২৯ শ। একটি বিএলসির বিপরীতে অন্তত চারজন জেলে পাশ নিয়ে থাকে মাছ ধরার জন্য। দুই রেঞ্জ মিলিয়ে শুধু মাছ ধরা সঙ্গে পশ্চিম বিভাগে ৭০ হাজার জেলে জড়িত। এ ছাড়া কাঁকড়া ধরা ও মধু আহরণ কাজের সঙ্গে অনন্ত ৫০ হাজার মানুষ জড়িত। এসব কাজে খুলনা ও সাতক্ষীরা উপকূলের প্রায় ৫ লাখ মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরেই সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব পরিবার অনেকটা অসহায় ভাবে জীবন যাপন করছে। আর এত অভাব আর অনাটনের মধ্য দিয়ে কেটে গেল একটি ঈদ। জোড়শিং গ্রমের জেলে সোলাইমান মোড়ল বলেন,সুন্দরবন বন্ধের সময় মৎস্য বিভাগ থেকে কিছু চাল দেওয়া হয়েছে। তা আবার সুন্দরবনের সব জেলেরা পাইনি। মৎস্য কার্ডধারী জেলেরা ছাড়া চাল দেওয়া হয়নি। তবে সুন্দরবনের অনেক বিএলসি ধারী জেলেরা এ সকল চাল থেকে বঞ্চিত। একই গ্রামের কাঁকড়া ব্যবসায়ী নবা মোল্যা বলেন, প্রজনন মৌসুমে মাছের পাশ পারমিট বন্ধ করে রাখলেও কাঁকড়ার পাশ দিলে কাঁকড়া ধরে জেলেরা একটু খেয়ে পরে বেঁচে থাকতো পারতো। সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) এম.এ হাসান বলেন, সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মৎস্য বিভাগ। সেই সময় সুন্দরবনেও মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এ দপ্তর। তবে জুন, জুলাই এবং আগস্ট মাসে সুন্দরবনে মাছ ধরার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বন বিভাগ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এই সময়টা সুন্দরবনের নদী খালে মাছের প্রজনন ঘটে। বছরের বাকি সময় যাতে জেলেরা মাছ ধরতে পারে এজন্য এ সময়টা মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে জেলেদেরই ভালো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের ওপর যেসব জেলে নির্ভরশীল তাদের সরকারি সহায়তা প্রদানে বন বিভাগ থেকে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের (ডিএফও) ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলেন, প্রজনন মৌসুমের কারণে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। জেলেদের আর্থিক সহায়তা করে থাকে মৎস্য বিভাগ। জেলে কার্ডধারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সকল জেলেদেরই সহায়তা দেওয়া হবে।