খুলনার রূপসায় বখাটেদের ছুরিকাঘাতে হৃদয় শেখ (১৯) হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত বখাটে যুবকদের নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি পক্ষের ইন্দন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নেপথ্যে থাকা কলকাঠি নাড়ানো প্রভাবশালীদের বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনকে ক্ষতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এদিকে, এ ঘটনার পর থেকে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর আগে ২০ এপ্রিল সন্ধ্যায় হৃদয় শেখকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর মহড়া দিয়ে এলাকা ছাড়ে বখাটে ওই সংঘবদ্ধ যুবকেরা।
নিহতের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পাওনা টাকা নিয়ে হৃদয় শেখের খালাতো ভাই মিঠু সরদারের সাথে স্থানীয় কয়েকজন বখাটে যুবকদের বাকবিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে তারা মিঠুকে মারধরসহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে থাকে। মিঠুকে মারধরের সময় খালাতো ভাই হৃদয় শেখ বাধা দিতে গেলে তার বুকে ধারালো গুপ্তি (ছুরি) দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে হৃদয় শেখের মৃত্যু হয়।
এদিকে চায়ের দোকানী হৃদয় শেখ হত্যাকান্ডের আশপাশ এলাকায় চায়ের দোকানের সন্নিকটে মাদকাসক্ত বখাটে কিশোর ও যুবকদের দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিয়ত আনাগোনা ছিলো বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। এমনকি ওই স্পট থেকে মাদক বিক্রি করা হত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় জনগণ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি দুপুরে পূর্ব রূপসা ঢাকার রোড এলাকার মোকসেদ মোল্লার বাড়ির সামনে থেকে জেলা গোয়েন্দা ডিবি পুলিশ কর্তৃক অভিযান পরিচালনা করে নিহত হৃদয় শেখের আপন ভাই নয়ন শেখকে ১শ গ্রাম গাজাসহ আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করে। কিন্তুনয়নের মা কুলসুম ওরফে খুশি তার ছেলে নয়নকে আটক করার কারণে ওই ডিবি পুলিশকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি প্রদান করে। এ ঘটনায় ডিবি অফিসার নয়নের মা খুশির বিরুদ্ধে রূপসা থানায় জিডি করেন। এই খুশি’র নামে রূপসা ও খুলনা সদর থানায় ৫টি মাদক মামলা রয়েছে। এমনকি ছেলে নয়নের বিরুদ্ধেও ৪টি মাদক মামলা রয়েছে। এছাড়াও পূর্ব রূপসা বাসস্ট্যান্ড পুলিশ ফাঁড়ির সামনে চায়ের দোকানদার আহত মিঠু সরদারের বিরুদ্ধে বাগেরহাট সদর ও রূপসা থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। ঘটনার দিন আহত মিঠু সরদার ও হৃদয় হত্যাকান্ডের আসামিরা মাদকাসক্ত ছিলো এমন অভিযোগ উঠে এসেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে।
এদিকে, হৃদয় শেখ হত্যাকান্ডের ঘটনায় তার পিতা হারুন শেখ বাদী হয়ে রূপসা থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৪-৫ জনের নামে শুক্রবার মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ ও র্যাব পৃথক অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত ৬ আসামীকে গ্রেফতার করেছে। এরমধ্যে ২১ এপ্রিল র্যাব-৬ পূর্ব রূপসা ঘাট এলাকা থেকে বাগমারা গ্রামের মো. শহিদুল ইসলাম শেখ এর ছেলে মো. রিয়াদ হোসেন তন্ময় (২২) ও গহর আলী মীরের ছেলে মো. ইমরান আলীকে (২০) গ্রেফতার করেছে। এর আগে পুলিশ বাগমারা গ্রামের আড্ডা গলির ইউসুফ সরদারের ছেলে শাহিন ও তুহিন এবং আফসার শেখ এর ছেলে নাজমুল শেখ (২২) ও শফিকুলকে গ্রেফতার করে।
উল্লেখ্য, বাগমারা গ্রামের মীর বাড়ির মৃত আবুল কালাম সরদারের ছেলে মিঠু সরদার ও তার খালাতো ভাই হারুন শেখ এর ছেলে হৃদয় শেখ পূর্ব রূপসা বাসস্ট্যান্ড পুলিশ ফাঁড়ির সামনে চায়ের দোকান দেয়। গত কয়েক মাস ধরে পূর্ব রূপসা বাজারের আড্ডা গলির মৃত পলাশের ছেলে হৃদয় ও অন্তর মিঠুর দোকানে বাকিতে চা ও অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী ক্রয় করে খায়। ২০ এপ্রিল দুপুরে দোকানদার মিঠু, খরিদ্দার হৃদয় ও অন্তরের নিকট পাওনা টাকা চাইলে উভয়ের মধ্যে বাক-বিতন্ডা ঘটে। ওই ঘটনার জের ধরে ইফতারির পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে হৃদয় ও অন্তরসহ ১০-১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল দোকানে এসে মিঠুকে মারপিটসহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এ সময় মিঠুকে তাদের কবল থেকে রক্ষা করতে খালাতো ভাই হৃদয় শেখ এগিয়ে গেলে তার বুকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় সঙ্গবদ্ধ দলটি। এ সময় নাজমুল প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত হয়। পরে হৃদয়ের পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়রা রক্তাক্ত জখম অবস্থায় আহত মিঠু ও হৃদয়কে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক হৃদয়কে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এ ছাড়া স্থানীয়রা নাজমুলকে উদ্ধার করে রূপসার একটি স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি করে। চিকিৎসা শেষে আহত নাজমুলের বাড়ি থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। এর আগে পুলিশ শাহীন ও তুহিনকে গ্রেফতার করে।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরদার মোশাররফ হোসেন জানান, হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করা গেছে। ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জড়িতদের গ্রেফতার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।