খুলনার পাইকগাছায় সুন্দরবন কোলঘেঁষা প্রত্যন্ত ইউনিয়ন গড়ইখালী। চারিপাশে লবণাক্ত পানি। বৃষ্টি পানি সংরক্ষণ ও তা কৃষি কাজে ব্যবহ্রা করে ১৪ গ্রামের হাজারো কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক। পাইকগাছায় ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে গড়ইখালী কয়রা উপজেলার সীমান্ত। ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঘোষখালী (বদ্ধ) নদী। নদীর দু’পারের মানুষের জীবীকার মূল উৎস কৃষি। আর কৃষিকাজে সেচের একমাত্র উৎস ঘোষখালী নদী। তবে বদ্ধ এ নদীর বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরত। ফলে দখলদারদের কারণে গরীব কৃষক এ নদীর পানি ব্যবহার করতে পারতেন না। নদীর পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে পুকুর, জলাশয়, ডোবা ও খালে সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি দ্বারা তিন ভাগের এক ভাগ জমিতে সেচের মাধ্যমে আবাদ হতো। আর সেচের অভাবে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি পতিত পড়ে থাকতো। ফলে গ্রামগুলোর অধিকাংশ পুরুষ মানুষ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতেন। প্রায় দুই যুগের বেশি সময় এভাবে চলছিল তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। অবশেষে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান জি এম আবদুস ছালাম কেরু) হস্তক্ষেপে দখল মুক্ত হয় বদ্ধ ঘোষখালী নদী। সেচ কাজে নদীর পানি ব্যবহারে আর বাঁধা না থাকলেও দেখা দেয় ভিন্ন সমস্যা। বদ্ধ এ নদীর একপ্রান্তে অবস্থিত স্লুইচ গেটের জলকপাটটি জরাজীর্ণ হওয়ায় প্রমত্ত শিবসার প্রবল জোয়ারের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হচ্ছিলো কৃষিজমি। এবার তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেন ইউপি চেয়ারম্যান। স্থানীয় সংসদ সদস্য আক্তারু জ্জামান বাবু সহযোগীতায় বদ্ধ নদীতে বাঁধ নির্মাণে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থও দেন তিনি। সেই অর্থ দিয়ে বদ্ধ নদীতে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মাণ করা হয় বাঁধ। বাঁধ নির্মাণের ফলে বদ্ধ এ নদীটি মিষ্টি পানির জলাধার হিসেবে সংরক্ষণে গ্রামের কৃষক ও কৃষিতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। চলতি মৌসুমে নদীর আশপাশের ৭১৫হেক্টর অর্থাৎ ৫,৩৬২.৫ বিঘা জমিতে সবুজের সমারোহ। গ্রামজুড়ে কর্মমুখর পরিবেশ। গড়ইখালী ইউনিয়ন গোটা উপজেলার মধ্যে কৃষির পাশাপাশি সবজি চাষের মডেল ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এক সময়ের দরিদ্র গ্রামগুলোর হাজার হাজার মানুষ এখন সমৃদ্ধশালী। স্থানীয় কৃষক কুমারেশ সরদার, মাধুরী বাইন, পরিতোষ সানা, কুমুদ সানা, রাধা কান্ত সরদার, সুজিত সানা, দিপংকর সানা, বিজয় রায়, ফনিন্দ্র নাথ মন্ডল জানান, উপজেলার প্রত্যন্ত এ ইউনিয়নটি কৃষি নির্ভর। তবে পর্যাপ্ত সেচ সুবিধার একমাত্র উৎস স্থানীয় ঘোষখালী (বদ্ধ) নদীর পানি ব্যবহারের উপযুক্ত কোন ব্যবস্থা না থাকায় একেবারে ধিমিয়ে পড়েছিল এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা।অবশেষে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানের নিরালস প্রচেষ্টায় ধিমিয়ে পড়া কৃষি ব্যবস্থাকে সচল এবং কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে বদ্ধ এ নদী দখল মুক্ত করা সহ লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মাণ করেন বাঁধ। বাঁধ নির্মাণের ফলে বদ্ধ এ নদীটি মিষ্টি পানির ট্যাংকি হিসেবে সংরক্ষিত হওয়ায় গ্রামগুলোর কৃষিতে বিপ্লব এসেছে। স্থানীয় কৃষক শত শত বিঘা জমিতে তরমুজ, লাউ, শিম, টমেটো, কপি, মুলা ও মরিচসহ নানা ধরনের সবজি। প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। গড়ইখালী ইউনিয়ন যুবলীগের সম্পাদক মানবেন্দ্র মন্ডল, ইউনিয়ন কৃষকলীগের সদস্য সচিব প্রভাষক ইমতিয়াজ ও স্কুল শিক্ষক হাফিজুর রহমান জানান, জমিতে সেচ দেয়ার জন্য আগে বদ্ধ এ নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। মিষ্টি পানির অভাবে ফসলাদি ভালো হতো না বলে গড়ইখালী গ্রামে অভাব লেগেই ছিল। এখন গ্রামের চিত্র বদলে গেছে। কৃষকরা এখন পর্যাপ্ত ধান ও সবজির আবাদ করেছেন। দূর হয়েছে তাদের অভাব। গড়ইখালী ইউনিয়ন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাধক ঢালী ও ইয়াছিন আলী খান বলেন, ঘোষখালী (বদ্ধ) নদীকে মিষ্টি পানির জলাধার হিসেবে সংরক্ষণ করায় পর্যাপ্ত সেচের সুবিধা পেয়ে উনিয়নের ১৪টি গ্রামের ৭শত ১৫হেক্টর জমিতে নতুন করে এবার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে বোরোর চাষ ও বাকি জমিতে ৪৫০হেক্টর তরমুজ, ৭০হেক্টর করলা, ৫হেক্টর বাদাম, ১০হেক্টর মিষ্টি আলু এবং ৮০হেক্টর জমিতে ঢেড়স, মিষ্টি কুমড়া, বরবুটি, চিচিংগা, পুইশাক সহ বিভিন্ন সবজির চাষ হয়েছে। গতবছর থেকে এবছর ফসল উৎপাদনের হার দ্বিগুনেরও বেশী। এবার বিঘা প্রতি জমিতে ধান চাষ করে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং সবজি চাষ করে গড়ে প্রতি বিঘা থেকে অন্তত লক্ষাধিক টাকা আয় করার আশা কৃষকদের। পর্যাপ্ত পরিমাণে ধান ও সবজির আবাদ এখানকার কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এতে তাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। গড়ইখালী ইউপি চেয়ারম্যান জি এম আবদুস ছালাম বলেন, জনপ্রতিনিধির কাজ হচ্ছে জনসেবা করা। আমি শুধু আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি। গ্রামবাসীরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চরম প্রতিকূলতা জয় করেছেন। সেচ সুবিধা পেয়ে ইউনিয়নের মানুষ কৃষিতে যে সাফল্য অর্জন করেছেন তা অবিশ্বাস্য। পরিবর্তন এসেছে তাদের জীবনযাত্রায়। জমি আবাদ করে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করেছেন তারা। আগে জমিগুলো পড়ে থাকত। এখন তারা আবাদ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সহায়তা পেলে গ্রামের মানুষ তার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গড়ইখালী ইউনিয়নবাসি।