ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নূপূর সাহার বিরুদ্ধে করোনার স্যাম্পল বিলে অনিয়ম, করোনা সামগ্রী কেনায় অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, দূর্নীতি ও নানান অভিযোগ উঠেছে। করোনাকালে বিভিন্ন জায়গা থেকে করোনাসামগ্রী কাগজে কেনাকাটা দেখালেও বাস্তবে তার কোন হদিস মেলেনি। তাছাড়া যাতায়াত বিলেও রয়েছে অসংগতি। এছাড়াও বন্ধের দিন সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে পাশের জেলা কিশোরগঞ্জ কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে রেনেসাঁ হাসপাতাল এ- ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে স্ত্রী রোগ ও প্রসূতী বিদ্যা চিকিৎসক হিসাবে রোগী দেখেন। পাশপাশি আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে মালিকানা রয়েছে বলে দাবি অনেকের। পাশপাশি সরকারি বিভিন্ন সেবার নামে অনেক টাকা আত্বসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব বিষয়ে আশুগঞ্জ এলাকাবাসীর পক্ষে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের সচিব বরাবর একটি অভিযোগ দিয়েছে আ: সাত্তার নামে এক ব্যক্তি। তবে তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। নূপুর সাহা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে জানান।
অভিযোগে দেয়া বিভিন্ন কাগজপত্র যাচাই ও সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন ডা. নূপুর সাহা। যোগদানের পর থেকে কিছুদিন সবকিছু ভালোভাবে চললেও কিছুদিন না যেতেই পরে সব চলে উল্টোপথে। করোনার মাহামারি চলাকালিন বিভিন্ন মালামাল কেনার সময় দেখা যায় নানান অসংগতি। করোনার স্যাম্পল বিলে অনিয়ম, করোনা সামগ্রী কেনায় অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্বসাৎ, দূর্নীতি ও নানান অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও অর্ধকোটি টাকা দামের সরকারী গাড়ী তার ব্যক্তিগত চালক দিয়ে তার নিজের জেলা জেলা কিশোরগঞ্জের একটি বেসরকারী হাসপাতালে রোগী দেখতে যান তিনি। করোনাস্যাম্পল পাঠানোর নামে বিভিন্ন সময়ে ভু’য়া ভাউচার দিয়ে এক লাখ বিশ হাজার চারশত টাকা আত্বসাতের অভিযোগ রয়েছে। করোনাকালে বিভিন্ন দোকান থেকে এক লাখ ৫২ হাজার টাকার সামগ্রী কেনার ভাউচার দিয়ে বিল তোলা হলেও বাস্তবে তিনি কিছুই কেনেন নি। অ্যাম্বুলেন্স মেরামত বাবাদ ১ লাখ ১২ হাজার ৫’শত টাকা উত্তোলন করেছেন। কম্পিউটার মেরামত বাবাদ তোলেছেন ৩৭ হাজার টাকা। করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে ২০২০-২১ অর্থবছরে কোন রোগী ভর্তি না হলেও পরিস্কার খরচ বাবদ উত্তোলন করেছেন ২৭ হাজার ৯০০ টাকা। টিএ বিলে একই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিভিল সার্জন অফিসে যাতায়াত ও ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন খরচ উত্তোলন করেছেন। একই দিনে দুটি ভ্রমণ বিল উত্তোলন করেন। সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে তিনি শুক্রবার বন্ধের দিনে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলায় প্রাইভেট প্রেক্টিসে যান। আউটসোর্সিংএর মাধ্যমে নেয়া ৪ জন কর্মচারির নাম পরিবর্তন করে হাসপাতালের ইনডোরে ভর্তি দেখিয়েছেন। এমএসআর এর ঠিকাদারের মাধ্যমে ঔষদ নেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তিনি কিছুই নেন না। ২০২০-২০২১ অর্থবছরের হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বিল বেনামে উত্তোলন করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০২০-২০২১ অর্থবছরের হাসপাতালের সাব-সেন্টারের লিলেন কেনার নামেও লাখ টাকা আত্বসাতের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও তার অধিনস্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা তার দ্বারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব বিষয়ে নথিতে থাকা কাগজপত্র যাচাই করে দেখা যায়, সদু মিয়া নামে সিএনজি ভাড়া দেখানো হয়েছে ২০২০ এর জুনে ১২ হাজার ৬’শ টাকা, আগস্ট ১২ হাজার ৬’শ টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে ১১ হাজার ২’শ টাকা, অক্টোবর ১২ হাজার ৬’শ টাকা, নভেম্বরে ১২ হাজার ৬’শ টাকা, ডিসেম্বর ১১ হাজার দুইশ টাকা ও ২০২১ এর জুন মাসে ১১ হাজার দুইশ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। হ্যান্ডওয়াস কেনা বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ২৪ হাজার সাতশ টাকা। এসএ ডিজিটাল সাইন থেকে পোষ্টার বানানো বাবদ ২৪ হাজার ৫’শ টাকা ও লিফলেট ১৪ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। আশুগঞ্জ সার্জিকেল এ- মেডিকেল ইকুইপমেন্ট থেকে দুইবার সার্জিকেল মাস্ক কেনা বাবদ ২৪ হাজার ৬৫০ টাকা ও সার্জিকেল মাস্ক কেনা বাবদ ২৪ হাজার ৬৫০ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। করোনা সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় দেখানো হয়েছে ২৪ হাজার টাকা, বিভিন্ন সময়ে পোষ্টার ৭ হাজার দুইশ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স এর ডেন্টিও পেইন্টি বাবাদ খরচ দেখানো হয়েছে ২৪ হাজার টাকা, ভৈরবের তাজিম মটরস থেকে কেনা দুটি টায়ার এর খরচ দেখানো হয়েছে ২৪ হাজার ৬’শ টাকা ও ব্যাটারি কেনা বাবদ ১২ হাজার ৫’শ টাকা, লুকিং গ্লাস ও হেড লাইট মেরামত বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ২০ হাজার ৫’শ টাকা,সার্ভিসিং৬ হাজার একশ টাকা। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার জীপ গাড়ি মেরামত বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪ হাজার আটশ টাকা। হাসপাতালের অফিস শাখার জন্য এইচপি মনিটর কেনা হয়েছে ২০ হাজার টাকায়। কম্পিউটারের ইউপিএস এর ব্যটারি কেনা হয়েছে ১৭ হাজার টাকায়। হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের পরিস্কার বাবদ এক মাসের বিল দেখানো হয়েছে ১৩ হাজার নয়শ, ১৩ হাজার ৯৫০ টাকা। ২০২০-২০২১ অর্থবছরের হাসপাতালের সাব-সেন্টারের লিলেন সামগ্রী কেনা বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯৫ টাকা। দুটি সাব সেন্টার পরিস্কার বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ১০ হাজার ৮০০ টাকা। ডিসেম্বর ২০২০ সালের হাসপাতালের পরিস্কার বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ১৮ হাজার নয়শ টাকা, ফেব্রুয়ারি ২০২১ মাসের হাসপাতাল পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৫ হাজার দুইশ টাকা। এই মাসে সাব সেন্টার পরিস্কার বাবদ ব্যয় ১০ হাজার আটশ টাকা দেখানো হয়েছে। জুন ২০২১ এর হাসপাতালের ময়লা আবর্জনা পরিস্কার বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৫ হাজার দুইশ টাকা, সাব সেন্টার এর ২০২১ সালের জুন মাসে পরিস্কার বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৩ হাজার ৬’শ টাকা, খালের কচুরিপানা পরিস্কার বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৫ হাজার দুইশ টাকা। মনোহরি মালামাল ক্রয় জানুয়ারি হতে জুন পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৫ হাজার ৫০ টাকা।
সিএনজি বিল ভাউচারে থাকা সদু মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার কোন সিএনজি নাই। আগে অন্য জায়গা থেকে সিএনজি এনে দিয়ে আমি টাকা নিয়েছি। তার সাথে দেখা করতে চাইলে বস্ত আছে বলে মোবাইল কল কেটে দেন। পরে আর কল করে তাকে পাওয়া যায়নি।
আশুগঞ্জ সার্জিকেল এ- মেডিকেল ইকুইপমেন্ট এর দায়িত্বে থাকা মাহাদি হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান গত জুন মাসে আমাদের এখান থেকে আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উল্লিখিত ভাউচারে কোন মালামাল বিক্রি করা হয়নি।ভৈরবের তাজিম মটরস এর মালিক মো কবির মিয়া জানান, মাঝে মাঝে আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এম্ব্যুলেন্সের কিছু মালামাল কিনে তারা। তবে ব্যাটারি ও অন্যান্য মালামাল আমরা বিক্রিকরি না। হয়তো আমাদের ভাউচারে অন্য কেউ সই দিয়ে এটি ব্যবহার করেছে।ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের এসএ ডিজিটাল সাইনের মালিক মো.জসিম উদ্দিন খানের সাথে যোগাযোগ করা কলে তিনি জানান, যে ভাউচারের মাধ্যমে বিল তোলা হয়েছে সেখানে থাকা আমার স্বাক্ষরটি আমার নয়। আর এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের সচিব বরাবর অভিযোগ দেয়া আ: সাত্তারের মোবাইল নাম্বার ও যোগাযোগের ঠিকানা না থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নূপুর সাহা বলেন, আমার নামে এসব অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। আমার কোন স্টাফ হয়তো এসব গোপন ভাউচার লিক করে দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। কেউ হয়তো আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এসব মিথ্যা কথা বলছে। আমি কোন ভাউচার না দেখে স্বাক্ষর করি না। কেনাকাটায় আমার কোন অনিয়ম নাই। আমি এই হাসপাতালটিকে একটি ভাল যায়গায় নিয়ে এসেছি। আগে এই হাসপাতালের অবস্থা অনেক খারাপ ছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ বলেন, আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নূপুর সাহার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে এখনো লিখিতভাবে কিছু পাইনি। পাশাপাশি আমার কাছে কোন অভিযোগের কপিও আসেনি। আসলে তদন্ত করে দেখে সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।