খুলনা জেলার দিঘলিয়া উপজেলার শেষ প্রান্তের একাংশে আতাই ও মজুদখালি নদী। এই নদীটির ত্রিমোহনায় অবস্থিত আড়ুয়া - আবালগাতি খেয়াঘাট। এ ঘাটটিতে ঠিকাদার ও ইজারাদারদের সীমাহীন অনিয়ম,দুর্ণীতি ও জুলুমের কারণে পারাপার যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রাচীন ঐতিহ্যে ঘেরা এই খেয়াঘাটটি।
দিঘলিয়া উপজেলার স্থল পথ ও নৌপথের একটি পর্যটন কেন্দ্রও বটে। এখানে কেউ ভ্রমনে আসলে একসাথে যেমন তিনটি নদীর মিলনস্থল দেখতে পাবেন, তেমনি তিনটি জেলা যথা যশোর, খুলনা, নড়াইলের অপূর্ব সীমানাও অবোলকন করতে পারবেন। আড়ুয়া খেয়াঘাট মূলত বারাকপুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়ারচর, লক্ষীকাটি, আড়ুয়া, আমবাড়িয়া, রাধামাধবপুর, গাজীরহাট ইউনিয়নের আমবাড়িয়া, আবালগাতি, ডুমরা এবং যশোরের সিদ্ধিপাশা ইউনিয়নের জয়রাবাদ, আমতলা ও চন্দ্রপুরসহ ১১ টি গ্রামের লোকজনের চারণভূমি।
এলাকার নেতৃস্থানীয় লোকজন এ প্রতিবেদককে জানান, আড়ুয়া মূলত কৃষি নির্ভর ও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় জীবনযাত্রার মান একটু নিম্নমানের। তবে অত্র এলাকার জনগনের সহজ সরল মনোভাব ও আতিথেয়তার জুড়ি নেই। উপর্যুক্ত ১১ গ্রামের মানুষ বিলে-ক্ষেতে কৃষি কাজ করে মনের খোরাক ও সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে ছোটে খেয়া পারাপারের ঘাটের দিকে। দুপুর থেকেই যত বেলা গড়ায় ততই জমজমাট হতে থাকে এই ঘাট এলাকা। আর রাত ১০ টা অবধি চলে এ খেয়াঘাটের চা চক্রের বাজার। ছোট, বড়ো-বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সব বয়সী ও পেশা শ্রেণির মানুষের মিলনমেলা হওয়াতে খেয়াঘাটকে অত্র এলাকার মিলনায়তন বা জাতীয় সংসদ ও বলা হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগায় এটি খেয়াঘাট থেকে বাজারে রূপান্তরিত হচ্ছে। ব্যবসায়ী বা ছোট খাটো বিনিয়োগকারীরা কেবলমাত্র বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে মাত্র।
এলাকার বিজ্ঞমহল ক্ষোভ প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, যাকে ঘিরে এত আয়োজন, এত জমজমাট পরিবেশ, এত ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণ সেই খেয়াঘাট এখন মৃতপ্রায়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সকলের নাভিশ্বাস উঠিয়ে ছেড়েছে এই বাজারে। মানুষ এখন খেয়াঘাট ছাড়লে হাফ ছেড়ে বাঁচে। নদীর ওপারের লোকজন দুঃখে ও ক্ষোভে খেয়াঘাটে আসাই বাদ দিয়েছে। হাতে গোনা ভ্রাম্যমান পর্যটক ছাড়া স্থানীয় বাজার করা লোকজনের আগের মত আসেনা। আগে চা স্টলগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। মানুষের ছিল সমাগম। এখন প্রায়ই দু-একটি টি ষ্টল ছাড়া প্রায় ষ্টল বন্ধ পাওয়া যায়। সন্ধ্যা ৭ টার পরে কোনো দোকানই খোলা থাকে না। অথচ দু বছর আগে ও যেখানের চিত্র ছিল ভিন্ন।
এলাকার বিজ্ঞমহলের জিজ্ঞাসা কি ঘটনা ঘটেছে বিগত দু বছরে? কেনো পাল্টে গেল আড়ুয়া খেয়াঘাটের রমরম মনোরম গণসমাগম পরিবেশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার গণ্যমান্য ও জনপ্রতিনিধিরা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, মূলত খেয়াঘাটের মালিকানা ছিলো বরাবরই অত্র এলাকার গরীব ও নিরীহ মাঝিদের দখলে। কিন্তু ২০২০ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে উঠতি ও সম্ভাবনাময় এ বাজার এলাকার জনগনের হাতছাড়া হয়ে যায়। বিপত্তিটা ঘটে সেখান থেকেই। বড় বড় রাজনৈতিক যোদ্ধাদের খুশি করে এলাকা ও খেয়াঘাট বাগিয়ে নিয়ে ক্ষমতা দখলের পায়তারা করে কিছু পক্ষ। এ কাজে তাদের বেশ সফলতাও এসেছে। আর তাদের করণেই এ খেয়াঘাট এলাকা বর্তমানে মানব শূণ্য অবস্থা। প্রাণহীন এ নিথর খেয়াঘাটটিতে এখন আর দেখা যায় না জন সমাগম।
তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, বিগত দু'বছরে খেয়াঘাট মূলত ঘাট মালিকের ঘাট বলেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছে। ঘাটের মালিক মানে সেই সবকিছুর মালিক এমননি ভাবের বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে ঘাট ইজারাদার বা ঘাট মালিকের কাছে। লোকজনকে মারধর থেকে শুরু করে হুমকি-ধামকি, অকথ্য ভাষা ব্যবহারসহ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সাধারণ জনগণকে অপমান-অপদস্ত,লাঞ্ছিত করা নিত্যদিনের ঘটনায় রূপ নেয়। দু'বছর আগে ও যেখানে খেয়া ভাড়া ছিলো ৩ টাকা সেখানে এখন ক্ষেত্র বিশেষে ১০ টাকা আদায় করা হয়। সরকারি ফেরিতে পার হলেও ঘাট মালিকের ভাড়া না দিয়ে পার হওয়ার উপায় নেই। সাথে লাঞ্চিত ও অপমানিত হবার আশঙ্কাতো রয়েছেই।
এলাকাবাসী আরো জানান, অত্র খেয়াঘাটের পাশেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী আড়ুয়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ওপারের ছাত্র- ছাত্রী অনেক। শিক্ষকসহ এ সকল ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিদিন খেয়া বা ফেরী পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। তাদের বিগত দিনগুলোতে খেয়া পারাপার ফ্রী থাকলেও এ দু'বছর টাকা দিয়ে পার হতে হচ্ছে।
দিঘলিয়া উপজেলা প্রশাসন বেশ কয়েক বার এ ঘাটের অনিয়মের কারণে ভ্রাম্যমান মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা করলেও ঘাট ইজারাদারদের আচরণগত তেমন পরিবর্তন আসেনি।
২০২০ সালে আড়ুয়া ঘাটের সরকারি ইজারা মূল্য ছিলো ২ লক্ষ টাকা সেই ঘাট ২০২২ সালে ডাক এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ লক্ষ টাকা। আমরা যেটা বলব বা করব সেটাই সেই নিয়মে চলবে আড়ুয়া খেয়াঘাট। আর এটাই আড়ুয়া খেয়াঘাট এলাকার বাস্তব চিত্র।
এলাকাবাসী এ প্রতিবেদককে আরো জানান, যেখানে বিগত দু'বছরে আড়ুয়ায় আর একটি বারাকপুর, দিঘলিয়া, সেনহাটির মতো বাজার হওয়ার মত পরিবেশ ছিল। সেখানে বাজার দূরে থাক, সেখানকার মানুষ এখন সর্বদা থাকে আতংকে। বাজারে স্থানীয়রা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে সাহস পাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লোকজন জানান, এমতাবস্থায় দিঘলিয়া উপজেলার সকল রাজনৈতিক, সামাজিক ও জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
এলাকাবাসী আরো জানান, ওই সমস্যা নিরসন কল্পে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করে সাধারণ জনগণের ভোগান্তি দূর করে একটি আধুনিক ও সময়োপযোগী বাজার গঠনে ভূমিকা নেওয়া জরুরী। কথায় নয়,, কাজে প্রমাণ করে সাধারণ নিরীহ জনগণকে জিম্মিদশা থেকে মুক্তির জন্য স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিকমহল ও সকল স্তরের জনপ্রতিনিধিদের কাছে জোর দাবী জানিয়েছেন।কর্যকরী পদক্ষেপের দাবী সর্ব মহলের