দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে।বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নিজেই একটা রোগী। ভিতরে চাকচিক্য পরিবেশ। বহির্বিভাগে রোগীদের কমতি নেই। প্রতিদিন লম্বা লাইন। বাইরের পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে এত সমস্যা। একদিকে যেমন জনবল সংকটে জর্জরিত অপর দিকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নানাবিধ ক্রনিক ডিজিজে জর্জারিত। কোটি কোটি টাকার আবাসিক ভবন গুলো পড়ে থকলেও থাকার লোক নেই। কমপ্লেক্স ভবনের পিছনে সুবিস্তৃত ভূমি থাকলেও কারা কিভাবে ভোগ করছে তা বাইরে থেকে জানার বা বোঝার উপায় নেই। জনবল সংকট যুগ যুগ ধরে চলে আসলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে কোন মাথা ব্যথা নেই। যার ফলশ্রুতিতে এই উপজেলার ৬ টি ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষ কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভৈরব, আতাই, আঠারোবাকী এবং মজুতখালী নদী বেষ্টিত ও খুলনা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন ও ত্রিখ-িত দিঘলিয়া উপজেলা।
খুলনা মহানগরীর আওতাভূক্ত আড়ংঘাটা ইউনিয়ন ও খানজাহান আলী থানার আওতাভূক্ত যোগীপোল ইউনিয়ন এবং খুলনা জেলার দিঘলিয়া থানার আওতাধীন ৪ টি ইউনিয়ন যথাক্রমে দিঘলিয়া সদর, সেনহাটী, বারাকপুর এবং গাজীরহাট ইউনিয়ন নিয়ে দিঘলিয়া উপজেলা গঠিত। ৬ টি ইউনিয়ন নিয়েই উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এ উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২ লক্ষাধিক। দ্বীপাঞ্চল এ দিঘলিয়া থানার ৪ টি ইউনিয়নে বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠেনি কোন হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিক। ৪ টি ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ২টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ১৬ টি কমিউনিটি ক্লিনিক।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ১৯৯২ সালে ৫.৩৯ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ২টি সংযুক্ত ভবনে ৫০ টি বেডের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও জনবল সংকটের কারণে কাঙ্খিত সেবা না পাওয়ার কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হতে রোগীদের অনীহা রয়েছে। অনেক রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না এসে সরাসরি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। অনেক মুমূর্ষু রোগী নদী পারাপার হয়ে শহরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় মারাও যায়।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে জনবল সংকট যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারদিকে শুধু নেই নেই অবস্থা। বর্তমানে ৫ জন মেডিকেল অফিসার, ওয়ার্ড বয় এবং নার্স দিয়ে হাসপাতালের সামগ্রিক চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। হাসপাতালের দোতলায় ১টি অপারেশন থিয়েটার থাকলেও কোন সার্জারি ডাক্তার নেই। এক্সরে মেশিন রয়েছে কিন্তু এটি পরিচালনার জন্য নেই কোনো রেডিও গ্রাফার। নেই কোন গাইনী বিশেষজ্ঞ, ডেন্টাল সার্জন। এ্যানেচথেশিয়া বা অজ্ঞান করার বিশেষজ্ঞ একজন ডাক্তারের পোষ্টিং থাকলেও অপারেশনের কোন কার্যক্রম না থাকার কারণে তিনি অন্যত্র প্রেশনে কাজ করছেন। আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। রোগী পরিবহনের জন্য ১টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে কিন্তু কোন ড্রাইভার নেই। আউটসোর্সিং এর এক জনকে দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি চালানো হচ্ছে। পুরোনো অ্যাম্বুলেন্সটি অকেজো অবস্থায় গ্যারেজে পড়ে আছে। অত্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার সৃষ্ট ২৮টি পদ সংখ্যার বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩ জন। শূণ্য পদ ১৫ জন। ৫ জন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা খুলনা শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেষণে কর্মরত আছেন। ১ জন ১২/১০/২০১৫ তারিখ থেকে কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিত আছেন। দ্বিতীয় শ্রেণির সৃষ্ট ৩৩ পদে কর্মরত আছেন ২৫ জন এবং শূণ্য রয়েছে ৮ জন( সিনিয়র স্টাফ নার্স)। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারির সৃষ্ট ৯০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৬২ জন এবং শূণ্য রয়েছে ২৮ জন। একজন উপঃ সহঃ কমিঃ মেডিঃ অফিসার (ইউএইচসি) প্রেষণে খুলনা শহরের টুটপাড়া আরবান ডিসপেনসারীতে কর্মরত আছেন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ২৫ সৃষ্টপদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৬ জন এবং শূণ্য রয়েছে ১৯টি পদ। অর্থাৎ ১৭৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০৬ জন। শূণ্য পদ রয়েছে ৭০ জন।
জরুরী বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে একজন উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার এর তত্ত্বাবধানে অফিস সহায়ক এবং আউট সোর্সিং এর ওয়ার্ড বয় দ্বারা এটি পরিচালিত হচ্ছে। গুরুতর রোগী আসা মাত্র তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নদী দ্বারা খুলনা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন নদী বেষ্টিত ও নদী দ্বারা দ্বিখ-িত দ্বীপাঞ্চল এ উপজেলা সদরসহ ৪ টি ইউনিয়নের কোথাও কোন ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিক না থাকার কারণে এ উপজেলার দেড় লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র আ¯্রয়াস্থল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিন্তু জনবল সংকটের কারণে যুগ যুগ ধরে এ এলাকার মানুষ তাঁদের কাক্সিক্ষত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৪’শ থেকে ৫’শ রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে অত্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে। বহির্বিভাগে আগত ও হাসপাতালে ভর্তি একাধিক রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেবার ব্যাপারে ও প্রয়োজনীয় ঔষুধ প্রাপ্তির ব্যাপারে তাদের কম বেশী অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত সংকট। আাবাসিকের জন্য কোটি কোটি টাকার বহুতল ভবনগুলোর করুণ দশা। ৭টি বহুতল ভবনের মধ্যে ৪টি ভবন পরিত্যক্ত। আবাসিক এলাকাতেও প্রতিকূল পরিবেশ বিদ্যমান। ৩টি বহুতল আবাসিক ভবন বসবাসের অনুকূল হলেও একজন এমও এবং কয়েকজন নার্স ছাড়া কেউ থাকেন না।পুরো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে বেহাল অবস্থা বিদ্যমান। সংরক্ষিত এলাকা হলেও সর্বদা অরক্ষিত পরিবেশ। হাসপাতালটি সর্বমোট ৫.৩৯ এক নিজস্ব জমির উপর প্রতিষ্টিত। জমির সামনের দিকে হাসপাতালের মূল ফটকসহ দুইটা ফটক রয়েছে। জায়গার অগ্রভাগে রয়েছে মসজিদ গ্যারেজ। তার পিছনেই অবস্থিত দুটো সংযুক্ত দক্ষিণমূখী ভবন। যে ভবনের নীচে রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নানা অফিস কক্ষ, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও অন্যান্য কর্মকর্তা এবং মেডিকেল অফিসারদের নিজস্ব কক্ষ, আউটডোর, করোনাভাইরাসের টিকা কেন্দ্র, প্যাথলোজী কক্ষসহ নানা কক্ষ রয়েছে। ভবনের উপরে রয়েছে করোনা রোগীর চিকিৎসা ইউনিট, ৫০ শয্যার পুরুষ ও মহিলা ইউনিট, ওটি কক্ষ, এক্স-রে কক্ষ, আলটাসোনোগ্রাফী কক্ষ, কমপ্লেক্সের ঔষুধ ডিপো কক্ষসহ নানা কক্ষ। নানা হতাশার মাঝেও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ মাহবুবুল আলম বলেন, খুব দ্রুতই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। রোগীরা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলটাসোনোগ্রাম করতে পারবে। হাসপাতালের পূর্ব সীমানা দিয়ে ৭টা আবাসিক ভবনের অবস্থান। হাসপাতালের পিছন দিকে বহুদূর বিস্তৃত সিংহভাগ জায়গা রয়েছে। যেখানে যুগ যুগ ধরেএকটা মহল নানা ফসল উৎপাদন করে ভোগ করে আসছে। কে কিভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জায়গায় ফসল উৎপাদন করছে জানতে চাইলে দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ মাহবুবুল আলম এ প্রতিবেদককে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানাতে রাজী হন নি। তবে তিনি জনবল সংকট ও আবাসিক ভবনগুলোর ব্যাপরে একাধিকবার উর্ধতনমহলকে জানিয়েছেন বলে জানান। এদিকে ব্রহ্মগাতী নিবাসী দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মচারী ওয়াসিম এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি হাসপাতালের পিছনে ৬০ শতক জমি বন্দোবস্ত ছাড়ায় ধান চাষ করেছি। তাকে জনৈক জন প্রতিনিধি তাকে চাষ করার জন্য মৌঋখিকভাবে বলেছেন বলে তিনি জানান। তিনি আরও জানান, হাসপাতালের সিংহভাগ জায়গা রমজানসহ আরও ২/৩ জন কর্মচারী গাছপালা লাগিয়ে, ঘাস লাগিয়ে ভোগ করে আসছে। এ ব্যাপারে কথা হয় দিঘলিয়া উপজেলা আ'লীগের সাধারণ সম্পাদক মোল্লা আকরাম হোসেন এর সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। তবে তিনি বলেন, সরকারি জায়গা নিয়মনীতির মধ্যে থেকে চাষাবাদ করা উচিৎ। সরকারি জায়গা সরকারি বন্দোবস্ত ছাড়া চাষাবাদ ও ভোগ দখলের ব্যাপারে কথা হয় দিঘলিয়া উপজেলা আ'লীগের সভাপতি খান নজরুল ইসলামের সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, সরকারি হাসপাতালের জায়গা একটি গোষ্ঠী বংশ পরস্পরায় যুগ যুগ ধরে সরকারি বন্দোবস্ত ছাড়া চাষাবাদ ও ভোগ দখল করে খাওয়া অনৈতিক ও জঘন্যতম অপরাধমুলক কাজ। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে কথা হয় দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাহবুবুল আলম এর সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জায়গা বন্দোবস্তের সুযোগ নেই। কর্মচারিগণ নিজেরা জমি পতিত না রেখে চাষাবাদ করে ভোগ করলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যদি কেউ বাণিজ্য করে তবে সেটা দোষণীয়।