পাবলিক ও রেলের ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়া এবং ভৈরব সেতু নির্মাণ এলাকার বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণে ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষের গড়িমসির কারণে ভৈরব সেতুর কাজ বন্ধ হওয়ার দ্বার প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে খুলনাবাসীর বহুকাঙ্খিত সেতুটি নির্মাণে আবারও জটিলতা দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভৈরব সেতুর কাজ শেষ হওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর মধ্যে এখনই দেখা দিয়েছে নানা জিজ্ঞাসা। দিঘলিয়া সেতু দিঘলিয়া তথা খুলনাবাসীর সাথে প্রহসনে রূপ নেবে না তো? তবে দ্রুত জমিগ্রহণ কাজ সম্পন্ন হবে বলে একসময় জানিয়েছিলেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা। গত ২০ ডিসেম্বর অধিগ্রহণকৃত ভূমির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য লে-আউটকৃত ভৈরব সেতুর উভয় পার্শ্বের জমি সরজমিনে পরিদর্শন করেছে পৃথক ২টি প্রতিনিধি দল।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোঃ মারুফুল আলম বলেছিলেন, জানুয়ারী মাসের মধ্যে ভৈরব সেতুর জমি অধিগ্রহণের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবন বলে একসময় জানিয়েছিলেন। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণের কাজ ফের ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ বন্ধ হওয়ার দ্বার প্রান্তে।
ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে ঢিমে তালে চলছিল ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ। ফলে খুলনাবাসীর বহুকাঙ্খিত সেতুটি নির্মাণে আবারও দেখা দিয়েছে চরম সংকট। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভৈরব সেতুর কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শুধু নয় সেতুর মূল কাজে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সেতু বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বার বার আশ্বাস দিয়েও ভৈরব সেতুর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সমস্যা উত্তরণে এখন আলোর মুখ দেখেনি। ভৈরব সেতু বাস্তবায়ন এলাকার সাধারণ মানুষের জমি অধিগ্রহণ, সেতুর পশ্চিম অংশের রেলের জমি নিষ্পত্তি ও সেতু এলাকায় বিদ্যুতের ৩০ খুঁটি স্থানান্তর। দ্রুত জমিগ্রহণ কাজ সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছিলেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা। গত ২০ ডিসেম্বর অধিগ্রহণকৃত ভূমির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য লে-আউটকৃত ভৈরব সেতুর উভয় পার্শ্বের জমি সরজমিনে পরিদর্শন করেছে পৃথক ২টি প্রতিনিধি দল।
এদিকে ভৈরব সেতু নির্মাণ কাজে দ্রুত গতি আনায়নের লক্ষ্যে একই দিন দিঘলিয়ার দেয়াড়া ইউনাইটেড ক্লাব মাঠে সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অফিস কক্ষে খুলনা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনিসুজ্জামান মাসুদ ভৈরব সেতুর কনসালটেন্ট টিম লিডার এবং ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন।
সওজের সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিঃ (করিম গ্রুপ) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভৈরব সেতু নির্মাণ কাজের কার্যাদেশ পায়। প্রথম অবস্থায় ছাড়পত্র সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেতু বাস্তবায়নকারী সংস্থা খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবনা পাঠাতে বিলম্ব করে। পরবর্তীতে সকল দপ্তরের ছাড়পত্র (এনওসি) পাওয়ার পর চলতি বছরের ২৪ মে সেতুর পূর্ব সাইট দিঘলিয়া উপজেলার দেয়াড়া ইউনাইটেড ক্লাবের সামনে সরকারি খাস জমিতে ( ঈদগাহের মধ্যে) সেতুর ২৫ নং পিলারের টেস্ট পাইলিংয়ের কাজের মধ্য দিয়ে ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এরপর একই স্থানে ২৪ নং পিলারের টেস্ট পাইলিং এর কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে সেতুর পূর্ব সাইট ভৈরব নদীর তীর সংলগ্ন সরকারি খাস জমির উপর ১৪ নং পিলারের টেস্ট পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর জমি অধিগ্রহণ না হওয়ার কারণে থমকে যায় ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানারকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
ভৈরব সেতুর জন্য দিঘলিয়া, মহেশ্বরপাশা এবং দেবনগর মৌজার মোট ১৭ দশমিক ৪৯ একর (৭ দশমিক ০৮ হেক্টর) ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন। এরমধ্যে সেতুর পূর্ব সাইট অর্থাৎ নগরীর কুলি বাগান থেকে রেলিগেট পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭ দশমিক ১১৩৬ একর (২ দশমিক ৮৮ হেক্টর) ভূমি রয়েছে। সেতুর উভয় পাশের ওই জমি অধিগ্রহণের জন্য খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এর কার্যালয় থেকে গত মাসে ভূমি অধিগ্রহণের এর কাজ দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার জন্য ২টি সংশোধিত প্রস্তাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রেরণ করে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সার্ভেয়ার টিম সেতুর উভয় পাশের লেআউট কৃত জমির পরিমাপ শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রিপোর্ট পেশ করে। গত ২০ ডিসেম্বর অধিগ্রহণকৃত ভূমির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মোঃ মারুফুল আলম এবং সেতু বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনিসুজ্জামান মাসুদের নেতৃত্ব পৃথক ২টি প্রতিনিধিদল যৌথভাবে লে-আউটকৃত ভৈরব সেতুর উভয় পার্শ্বের জমি সরজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহি অফিসার মোঃ মাহবুবুল আলম, ভৈরব সেতুর সুপারভেশন কনসালটেন্ট কমলেন্দু মজুমদার, সেতুর কনসালটেন্ট আরই বিই টিম লিডার রইসউদ্দিন মির্জা ও বেনজীর আহন্মেদ, সওজ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ রাশিদুর রেজা, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এম এ রিয়াজ কচি ও মোঃ হাফিজুর রহমান, ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিঃ (করিম গ্রুপ) এর ডিপিএম ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মিজানুর রহমান, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সার্বেয়ার মোঃ মোতালেব হোসেন, সওজ অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার মোঃ নাইমুল ইসলাম প্রমুখ।
জানা যায়, ভৈরব সেতুর পিলার বসবে মোট ৩০ টি। এরমধ্যে নদীর পশ্চিমপাশ অর্থাৎ নগরীর কুলিবাগান থেকে রেলিগেট ফেরিঘাট সংলগ্ন নদীর তীর পর্যন্ত ১ থেকে ১৪ নং পিলার বসবে। এই অংশের প্রথম পিলারটি বসবে নাগরীর কুলিবাগান আকাক্সক্ষা পাট গোডাউনের কর্ণারে। ৫ এবং ৬ নং পিলারের মাঝখান দিয়ে রেললাইন ক্রস করবে। এরপর ৭ এবং ৮ নং পিলার বসবে। ৯ থেকে ১৩ নং এই ৫ টি পিলার বসবে নগরীর রেলিগেট ঢাকা ট্রেডিং হাউজ লিঃ এর অভ্যন্তরে। এর ফলে রপ্তানিকারক এ প্রতিষ্ঠানটি ভাঙ্গা পড়বে। ১৭ থেকে ২৮ নং পিলার বসবে ভৈরব নদীর পূর্বপাশ অর্থাৎ দিঘলিয়া উপজেলার নগরঘাট বানিয়াঘাট ফেরী সংলগ্ন মধ্যবর্তী স্থান থেকে।
এ দিকে দিঘলিয়া তথা খুলনা বাসীর বহুদিনের কাঙ্খিত স্বপ্নের ভৈরব সেতু নির্মাণ কাজে ত্রিমুখী জটিলতার কারণে নির্মাণ কাজে ধীর গতি সাধারণ মানুষের মাঝে জন্ম দিচ্ছে নানা হতাশা ও ধম্রজাল।আর এ সকল সমস্যা নিয়ে কথা হয় ভৈরব সেতু বাস্তবায়নকারী খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনিসুজ্জামান মাসুদ এর সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, তিনটি সমস্যা নিয়েই কাজ এগিয়ে চলছে। খুব দ্রুতই বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণ করা হবে। এ কাজের জন্য ওজোপাডিকো কে খুঁটি অপসারণে সওজের পক্ষ থেকে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সেতুর পশ্চিম পারে নির্মিত সংযোগ সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় জায়গার মালিকানা রেলওয়ে সওজের নামে স্থানান্তরিত করবে। আর এ কাজ দ্রুততর সাথে এগিয়ে চলছে। সেতুর পূর্ব পাড়ে সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজে ভূমি অধিগ্রহণের কাজও খুব তাড়াতাড়ি শেষ করা হবে বলে তিনি জানান।