ফুলতলা উপজেলার আলোচিত মুসলিমা হত্যাকান্ডে নিজেদের দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আসামি রিয়াজ ও সোহেল। রোববার সন্ধ্যায় তাদের দু’জনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক নয়ন বিশ্বাস। জবানবন্দি শেষে তাদের দু’জনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফুলতলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তফা হাবিবুল্লাহ জানান, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার এমদাদ গাজীর মেয়ে মুসলিমা। গত ১২ বছর যাবত ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামে তাদের বসবাস। আইয়ান জুট মিলের শ্রমিক ছিল সে। হত্যাকান্ডের চারদিন আগে রাত সাড়ে আটটার দিকে আইয়ান জুট মিলের গাড়িতে মিলের সামনে নামে। সে সময় আসামি রিয়াজ চায়ের দোকানে বসে ধূমপান করছিল। মুসলিমাকে দেখে লোলুপ দৃষ্টি পড়ে রিয়াজের। মুসলিমার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করার জন্য হন্যে হয়ে পড়ে রিয়াজ। একসময় যোগাযোগ নম্বর পেয়ে যায়। কথা হয় মুসলিমার সাথে। কয়েকদিনের ফোনালাপে রিয়াজের প্রেমের ফাঁদে পা দেয় মুসলিমা।
রিয়াজ ও তার বন্ধু সোহেল দু’জনে মিলে পরিকল্পনা করতে থাকে কিভাবে মেয়েটিকে ফাঁদে ফেলে নিজেদের বাসনা চরিতার্থ করা যায়। ঘটনার রাতে রিয়াজের মোবাইল নম্বর থেকে সোহেল মুসলিমার নম্বরে ফোন দেয়। মুসলিমাকে বলা হয় তার সাথে দেখা করতে চায় রিয়াজ। কিন্তু রাতে দেখা করতে চায় না মুসলিমা, সে জানায় ’ তার বাবা খুব অসুস্থ তাই আসতে পারবে না’ পরে সোহেল মুসলিমাকে বলে ’ দেখা না করলে আত্মহত্যা করবে রিয়াজ’। একপর্যায়ে রাতেই দেখা করতে রাজি হয় মুসলিমা।
রিয়াজের সাথে দেখা করতে ঘর থেকে বাইরে আসলে মুসলিমাকে নিয়ে রিয়াজ ও সোহেল প্রথমে বেজেরডাঙ্গা বাজারে যায়। সেখানে রিয়াজ তাকে বিয়ের আশ্বাস দেয়। পরে তারা তিনজন মিলে বাজারের বিভিন্নস্থানে ঘুরে বেড়ায়। এরমধ্যে রিয়াজ তার দুঃসম্পর্কের দুলাভাই ইউসুফকে ফোন দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একটি ঘর প্রস্তুত করতে বলে। ইউসুফ আবার ফোন করে যুগ্নিপাশা গ্রামের মুনসুরকে ঘরের জন্য জানায়। রাত সাড়ে নয়টার দিকে তারা তিনজন মিলে মুনসুরের একটি কক্ষে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পরে সোহেলকে ঘর থেকে বের হতে বলে রিয়াজ মুসলিমাকে ধর্ষণ করে। আধাঘন্টা পর সোহেল ওই ঘরে ধর্ষণের জন্য গেলে মুসলিমা চিৎকার করে। পরে ঘর থেকে বের হয়ে আসে সোহেল।
এ ঘটনার পরে নিজেকে বাড়ি পৌঁছে দিতে রিয়াজকে অনুরোধ করে মুসলিমা। ঘর থেকে বাইরে এসে সোহেল আর রিয়াজ পরামর্শ করে যে, ধর্ষণের ঘটনা ফাঁস হলে তাদের সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। তাই দুই বন্ধু মুসলিমাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
রাত দেড়টার দিকে মুনসুরের বাড়ি থেকে বের হয় তিনজন। নির্জন রাস্তায় এসে মুসলিমার মুখ চেপে ধরে সোহেল। গায়ের ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দেয় রিয়াজ। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দু’পাশ থেকে ওড়না জোরে টেনে রাখে দু’জন। মৃত্যুর পর তার মরদেহে দু’জনে ফের ধর্ষণ করে। ঘটনাটি অন্য খাতে নিতে তার গায়ের ওড়না দিয়ে একটি গাছে ১০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখে। পওে লাশটি নামানো হয়। মুসলিমার লাশ যাতে কেউ চিনতে না পারে সেজন্য রিয়াজ তার বাড়ি থেকে ধারালো বটি এনে দেহ থেকে কেটে মাথাটি বিচ্ছিন্ন করে তার পরনের কাপড় খুলে নেয়। মস্তকবিহীন দেহটি উত্তরডিহির রেজাউল সরদারের ধান খেতে ফেলে দেয়। বিচ্ছিন্ন মস্তক মৃত দেহ থেকে খুলে নেওয়া কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ওই এলাকার নজরুলের নির্মাণাধীন বাড়ির বালুর নিচে পুতে রাখে রিয়াজ ও সোহেল।
২৬ জানুয়ারি লাশ উদ্ধারের সময় রিয়াজ ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিল, লক্ষ রাখছিলো পুলিশের গতিবিধির ওপর। তখন এ বিষয়টি পুলিশ আঁচ করতে পারেনি। রিয়াজের সাথে ভিকটিম মুসলিমার সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পারে পুলিশ। এরপর আসামি রিয়াজ সন্দেহে ওই এলাকার রিয়াজ নামের কয়েকজন যুবককে আটক করে থানা নিয়ে আসে। কিন্তু আটক করা যুবকদের মোবাইল নম্বরের সাথে মুসলিমার নাম্বারের কল দেওয়া নাম্বারের মিল পায় না পুলিশ। পরে মুসলিমার ফোন নম্বরের ইতিবৃত্ত বের করে প্রকৃত রিয়াজকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। কিন্তু এর আগে ফুলতলা থেকে পালিয়ে যায় আসামি রিয়াজ। সে পালিয়ে তার বড় ভাইয়ের শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপন করে। ২৯ জানুয়ারি সকালে পুলিশ এ হত্যকান্ডের অভিযোগে সোহেলকে গ্রেফতার করে। আর শুক্রবার রাতে র্যাব রিয়াজের মোবাইল ট্রাকিং করে ফরিদপুরের কানাইপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তফা বলেন, এ মামলার দুই আসামির অপকর্মের সহযোগী হিসেবে মুনসুর খাঁ ও ইউসুফ আলী আটক করা হয়েছে। তাদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।