খুলনার পাইকগাছায় রবি মৌসুমে ২০২১-২২ অর্থ বছরে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় সমলয় পদ্ধতিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে বোরো ধান রোপণের শুরুতেই দেখা দিয়েছে নানা অসংগতি। বীজতলা তৈরীতে জার্মিনেশন-ট্রে ও পলিথিন ব্লকে চারা উৎপাদন হলেও মেশিনে চারা রোপণ করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কৃষকরা ফিরে গেছেন শ্রমিক নিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে। পাইকগাছা কৃষি অধিদপ্তর চলতি বোরো মৌসুমে কৃষি প্রনোদনা কর্মসূচীর আওতায় উপজেলার কপোতাক্ষ তীরবর্তী সোনাতনকাটি এলাকায় ৫০একর জমি চিহ্নিত করে সেখানকার ৫২জন কৃষককে সমলয় বোরো আবাদের আওতায় নেয়। শুরুতে ১৮ ডিসেম্বর ’২১ চিহ্নিত ব্লকে কৃষি অধিদপ্তরের সার্বিক তত্তাবধায়নে প্রায় আড়াই হাজার জার্মিনেশন ট্রে ও বিকল্প পলিথিন বেডে বীজতলা তৈরীর পর গত ১৮ জানুয়ারি থেকে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চারা রোপণের উদ্বোধন করা হয়েছে। তবে এ পদ্ধতিতে চারা রোপণের উপযুক্ত মাটির অভাবে শুরতেই দেখাদেয় নানা বিপত্তি। কৃষকরা জানান, এ পদ্ধতির আওতায় বেলে-দোআঁশ মাটির প্রয়োজন হলেও এ খানকার মাটি ভিন্ন। একারনেই রাইসট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চারা রোপণ সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। যদিও বীজতলা থেকে চারা সংগ্রহ ও জমিতে চারা রোপণের জন্য শ্রমিক খরচ বিঘা প্রতি ১ হাজার ২শ’ টাকা হারে কৃষি অফিস থেকে বহণ করা হবে বলে কৃষকদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। ঐ ব্লকের কৃষক মো. জামিরুল ইসলাম গাজী জানান, সেখানে তাদের ৪ বিঘা জমি রয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের কথায় তিনিও সায় দিয়েছিলেন এ পদ্ধতির বোরো আবাদে। তাদেরকে বলা হয়, এ পদ্ধতির আবাদে সনাতন পদ্ধতি থেকে অর্থ এবং সময় দু’টোই সাশ্রয় হবে। শুধুমাত্র কৃষকদের পক্ষে নাঙ্গল ও সেচ খরচ বহণ করতে হবে বাকি খরচ কৃষি অফিস থেকেই বহণ করবে। তিনি আরো জানান, প্রতি বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করতে তাদের খরচ হচ্ছে, রোপণের জন্য শ্রমিক বাবদ ২ হাজার, বীজতলা থেকে চারা সংগ্রহ করতে ৫শ’ ও চাষের জন্য নাঙ্গল খরচ বাবদ ১ হাজার টাকাসহ সর্বমোট সাড়ে ৩ হাজার টাকা। যদিও কৃষি অফিস থেকে তাদেরকে বিঘা প্রতি ১ হাজার ২শ’ টাকা হারে সরবরাহ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। ব্লকের আরেক কৃষক জি এম আবদুস সাত্তার জানান, ওই বিলে তার ৯০ শতক জমি রয়েছে। সমলয় আবাদে বীজতলা তৈরী করতে তাদের ৫০ একর জমির জন্য ৩শ’ কেজি এসএল-৮এইচ (বোরো হাইব্রিড) জাতের বীজ সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া একর প্রতি ৫০ কেজি এমওপি ও ৬০ কেজি ডিএপি সরবরাহ করা হয়েছে। এরপর একর প্রতি ৯০ কেজি ইউরিয়া সার সরবরাহ করা হবে। তবে রাইসট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চারা রোপণ করতে না পারায় কৃষকরা ফিরে গেছেন সেই পুরনো পদ্ধতিতে। তারা অতিরিক্ত শ্রমিক বিনিয়োগ করে আবাদ করতে গুনতে হচ্ছে পুরনো হারে টাকা। যদিও কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষে এলাকায় সমলয়ে চাষাবাদে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ধান রোপণ এটাই প্রথম উল্লেখ করে বলা হয়, এ পদ্ধতিতে আবাদ করলে প্রতি ঘন্টায় ১ জন শ্রমিকের মাধ্যমে ১বিঘা জমি চাষ করা যায়। এভাবে প্রতিদিন ৮ঘন্টায় ৮ বিঘা জমি চাষ করলে খরচ ও অর্থে অপচয় উভয়ই কমে যাবে। সনাতন পদ্ধতিতে ৮ বিঘা জমিতে সেখানে শ্রমিক লাগবে ৩৫জন। খরচও হবে প্রায় তিনগুন বেশি। তবে নানা সংকটে কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আশার বাণী শেষ পর্যন্ত নিরাশায় পরিণত হয়েছে বলেও মনে করেন কৃষকদের অনেকে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সমলয় পদ্ধতিতে রাইসট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ধানের চারা রোপণ পদ্ধতি এ এলাকায় এটাই প্রথম। তবে শেষ পর্যন্ত মাটির কারণে মেশিনে চারা রোপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে সাড়ে ৪ হাজার জার্মিনেশন ট্রে প্রদানের কথা থাকলেও আড়াই হাজার ট্রে-প্রদানের ব্যাপারে সদুত্তর মেলেনি তার কাছ থেকে। প্রসঙ্গত, গত ১৮ জানুয়ারি সকাল ১০টায় উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের সোনাতনকাটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগমের সভাপতিত্বে রাইসট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ধান রোপণের উদ্বোধন করেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খুলনা অঞ্চল) অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. ফজলুল হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন, খুলনার কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. হাফিজুর রহমান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শিয়াবুদ্দীন ফিরোজ বুলু, জেলা প্রকৌশলী দিপংকর কুমার বালা, কৃষিসম্প্রসারণ কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার পোদ্দার, উপসহকরী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা ধূর্বজ্যোতি সরকারসহ অন্যান্যরা।