নানাবিধ জটিলতা নিরসনে দীর্ঘসূত্রীতার কারণে ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজে নেমে এসেছে ধীর গতি। ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়া, ভৈরব সেতুর গতি পথের বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণে বিদ্যুত বিভাগের গড়িমসি, সেতুর জন্য দরকারি রেলওয়ের জায়গা সেতু নির্মাণের জন্য অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনায় বিলম্ব সেতুর কাজকে বাঁধাগ্রস্থ করছে। এ সকল সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাঝে নিরাময়মুলক সমাধানে বিলম্ব হওয়ায় দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ধরে ঢিলা তালে চলছে ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ। ফলে খুলনাবাসীর দীর্ঘদিনের কাঙ্খিত স্বপ্নের ভৈরব সেতুটির নির্মাণে আবারও ধীরগতি দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভৈরব সেতুর কাজ শেষ হওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দিঘলিয়ার গণ মানুষের মাঝে ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে ভৈরব সেতুর বাস্তবায়ন কাজ নিয়ে নানা সংশয় নানা জিজ্ঞাসা। তবে দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ কাজ সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন জেলা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। সোমবার (২০ ডিসেম্বর) অধিগ্রহণকৃত ভূমির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য লে-আউটকৃত ভৈরব সেতুর উভয় পার্শ্বের জমি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন পৃথক ২টি প্রতিনিধি দল।
খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোঃ মারুফুল আলম এ প্রতিবেদককে জানান, আগামী দেড়/দুই মাসের মধ্যে ভৈরব সেতুর জমি অধিগ্রহণের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশা নিয়ে কাজ চলছে।’ এদিকে ভৈরব সেতু নির্মাণ কাজে দ্রুত গতি আনায়নের লক্ষ্যে একই দিন দিঘলিয়ার দেয়াড়া ইউনাইটেড ক্লাব মাঠে সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অফিস কক্ষে খুলনা সড়কের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনিসুজ্জামান মাসুদ ভৈরব সেতুর কনসালটেন্ট টিম লিডার এবং ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন। এ সময় ভৈরব সেতুর রূপকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ডক্টর মশিউর রহমানের দুই কর্মকর্তা এমএ রিয়াজ কচি ও মোহাম্মদ হাফিজ উপস্থিত ছিলেন।
সড়ক ও জনপথ সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিঃ (করিম গ্রুপ) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভৈরব সেতু নির্মাণ কাজের কার্যাদেশ পায়। প্রথম অবস্থায় ছাড়পত্র সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেতু বাস্তবায়নকারী সংস্থা খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবনা পাঠাতে বিলম্ব করে। পরবর্তীতে সকল দপ্তরের ছাড়পত্র (এনওসি) পাওয়ার পর চলতি বছরের ২৪ মে সেতুর পূর্ব সাইট দিঘলিয়া উপজেলার দেয়াড়া ইউনাইটেড ক্লাবের সামনে সরকারি খাস জমিতে ( ঈদগাহের মধ্যে) সেতুর ২৫ নং পিলারের টেস্ট পাইলিংয়ের কাজের মধ্য দিয়ে ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এরপর একই স্থানে ২৪ নং পিলারের টেস্ট পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে সেতুর পূর্ব সাইট ভৈরব নদীর তীর সংলগ্ন সরকারি খাস জমির উপর ১৪ নং পিলারের টেস্ট পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়। দীর্ঘ কয়েক মাস বিগত হলেও ভৈরব সেতু নির্মাণ কাজের জন্য বড় বাঁধা উত্তরণ সম্ভব হয়নি। জটিল ও কঠিন সমস্যাগুলো হলো ভৈরব সেতু বাস্তবায়ন এলাকায় পাবলিকের আওতাধীন ভূমি ও রেলওয়ের জায়গা অধিগ্রহণের কাজ সমাধান করা। পাশাপাশি ভৈরব সেতু এলাকার বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা। জমি অধিগ্রহণ না হওয়ার কারণে থমকে গিয়েছে ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানারকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। ভৈরব সেতুর জন্য দিঘলিয়া, মহেশ্বরপাশা এবং দেবনগর মৌজার মোট ১৭ দশমিক ৪৯ একর (৭ দশমিক ০৮ হেক্টর) ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন। এর মধ্যে সেতুর পশ্চিম পাশ অর্থাৎ নগরীর কুলি বাগান থেকে রেলিগেট পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭ দশমিক ১১৩৬ একর (২ দশমিক ৮৮ হেক্টর) ভূমি রয়েছে। সেতুর উভয় পাশের ওই জমি অধিগ্রহণের জন্য খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে গত মাসে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার জন্য ২টি সংশোধিত প্রস্তাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রেরণ করে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সার্ভেয়ার টিম সেতুর উভয় পাশের লেআউট কৃত জমির পরিমাপ শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রিপোর্ট পেশ করে।
সোমবার (২০ ডিসেম্বর) অধিগ্রহণকৃত ভূমির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মোঃ মারুফুল আলম এবং সেতু বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনিসুজ্জামান মাসুদের নেতৃত্ব পৃথক ২টি প্রতিনিধিদল যৌথভাবে লে-আউটকৃত ভৈরব সেতুর উভয় পার্শ্বের জমি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাহবুবুল আলম, ভৈরব সেতুর সুপারভিশন কনসালটেন্ট কমলেন্দু মজুমদার, সেতুর কনসালটেন্ট রিবি টিম লিডার রইসউদ্দিন মির্জা ও বেনজীর আহন্মেদ, সওজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ রাশিদুর রেজা, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ডক্টর মসিউর রহমানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এমএ রিয়াজ কচি ও মোঃ হাফিজুর রহমান, ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিঃ (করিম গ্রুপ) এর ডিপিএম ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মিজানুর রহমান, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মোঃ মোতালেব হোসেন, সওজ অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার মোঃ নাইমুল ইসলাম প্রমুখ। জানা যায়, ভৈরব সেতুর পিলার বসবে মোট ৩০ টি। এরমধ্যে নদীর পশ্চিমপাশ অর্থাৎ নগরীর কুলিবাগান থেকে রেলিগেট ফেরিঘাট সংলগ্ন নদীর তীর পর্যন্ত ১ থেকে ১৪ নং পিলার বসবে। এই অংশের প্রথম পিলারটি বসবে নাগরীর কুলিবাগান আকাক্সক্ষা পাট গোডাউনের কর্ণারে। ৫ এবং ৬ নং পিলারের মাঝখান দিয়ে রেললাইন ক্রস করবে। এরপর ৭ এবং ৮ নং পিলার বসবে। ৯ থেকে ১৩ নং এই ৫ টি পিলার বসবে নগরীর রেলিগেট ঢাকা ট্রেডিং হাউজ লিঃ এর অভ্যন্তরে। এর ফলে রপ্তানিকারক এ প্রতিষ্ঠানটি ভাঙ্গা পড়বে। ১৭ থেকে ২৮ নং পিলার বসবে ভৈরব নদীর পূর্বপাশ অর্থাৎ দিঘলিয়া উপজেলার নগরঘাট বানিয়াঘাট ফেরী সংলগ্ন মধ্যবর্তী স্থান থেকে উপজেলা সদরের কুকুরমারা পর্যন্ত।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর ভৈরব সেতুর নির্মাণ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। ভৈরব সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৩১৬ কিলোমিটার। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১৭ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ২ বছর। অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বরের মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজ শেষ করার কথা। সেতুটির নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছিলেন ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ চলবে। পাশাপাশি সেতুর ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ও অন্যান্য সমস্যা সমাধানের কাজও চলবে। যে সমস্যাগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খুলনার মানুষের স্বপ্নের ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ বাঁধাগ্রস্ত করার কারণ হতে পরে বলে মানুষ আশঙ্কা করছিল।