ঢাকায় পরিবহনে ছাত্রদের ভাড়া অর্ধেক করার দাবীতে কয়েকদিন ধরে আন্দোলন চলছে। ঘটছে গাড়ি পুড়া ও ভাংচুরের ঘটনা। গত ২৯ নভেম্বর সোমবার রাতে রামপুরা এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় বাস চাপায় নিহত হয় স্কুল ছাত্র মো. মাইনউদ্দিন ইসলাম দূর্জয় (১৫)। এতে আরো ক্ষুদ্ধ হয়ে আন্দোলনকারী ছাত্ররা আরো ৯টি গাড়ি পুঁড়িয়ে দেয়। দূর্জয়ের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলা সদরের হালুয়াপাড়ায়। এখানে আসলে খালাম্মাদের বাড়িতেই থাকত দূর্জয়। তাই কিশোর দূর্জয়ের অনাকাংখিত আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েছে তার পরিবার। ওদিকে সরাইলে পাঁচ খালাম্মার বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠছে ওই গ্রামের পরিবেশ। পারিবারিক সূত্র জানায়, দূর্জয়ের পিতা আবদুর রহমান প্রথমে পানিশ্বর ইউনিয়নের শাখাইতি গ্রামে থাকতেন। পরে চলে যান কালিকচ্ছ ইউনিয়নের বাঘবাড়ি এলাকায়। একসময় স্ত্রী ২ ছেলে ১ কন্যাসহ ৫ সদস্যের পরিবার নিয়ে ঢাকার রামপুরা এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন। ছোট একটি দোকানে চা বিক্রি করেন আবদুর রহমান। বড় ছেলে মনির হোসেন গাড়ি চালান। রামপুরা একরামুন্নেছা উচ্চবিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের মেধাবী ছাত্র দূর্জয় এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ফলাফলের অপেক্ষায় ছিল। কোন রকমে কষ্টেশিষ্টে চলছিল তাদের পরিবার। তারপরও দূর্জয়কে ঘিরে আশার আলো দেখতো তার পরিবার। গত কয়েকদিন ধরে ঢাকায় পরিবহনে ছাত্রদের হাফ ভাড়া করার দাবীতে আন্দোলন চলছিল। গত সোমবার রাত পোনে ১০টার দিকে রামপুরা তার ভগ্নিপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে রাস্তা পার হচ্ছিল। বিটিভি রোডের পলাশবাগ এলাকায় অনাবিল পরিবহনের একটি বাস আরেকটি বাসের সাথে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দূর্জয়কে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় দূর্জয়। নিহতের ভাবী জানায়, রাত ৯টার দিকে তার বন্ধু বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গেছে। ময়না তদন্ত শেষে মঙ্গলবার দুপুরে নিহত ছাত্রের লাশ তার বড় ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। হালুয়াপাড়ার বাসিন্ধা নিহতের আপন খালাত ভাই খোরশেদ মিয়া ও খালাত বোন ৪,৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী আসনের মহিলা ইউপি সদস্য মোছা: আমোদা বেগম জানান, জন্মস্থান সরাইলে হলেও তাদের নিজস্ব কোন বাড়ি নেই। দূর্জয় আসলে ৫-৬ দিন আমাদের বাড়িতেই থাকত। কারণ এখানে তার পাঁচ খালাম্মার বাড়ি। সবাই জানত এটাই তাদের বাড়ি। তাই সরাইলেই তার লাশ দাফন করা হবে। গতকাল রাতে জানাযা শেষে সরাইল বিকাল বাজার এলাকার কবরস্থানে দূর্জয়ের লাশ দাফন করা হয়েছে। সরজমিনে দেখা যায়, হালুয়াপাড়ায় দূর্জয়ের খালাদের বাড়িতে চলছে আহাজারি। খালাম্মাসহ সকল স্বজনদের চোখে অশ্রƒ। বাকরূদ্ধ কেউ কেউ। কিশোর দূর্জয়ের নির্মম এ মৃত্যুকে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারা।
পরীক্ষার ফল জানা হল না দূর্জয়ের: মেধাবী ছাত্র দূর্জয়। মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে খুবই উৎফুল্ল ছিল। ফলাফল ভাল হবে। ফল প্রকাশের পর আনন্দে মেতে ওঠবে। সকল স্বজনদের নিয়ে মিষ্টি খাবে। এমন হাজারো স্বপ্ন ছিল দূর্জয়ের। ফলাফল জানা হল না তার। সকল স্বপ্ন অপূরণীয়ই থেকে গেল দূর্জয়ের।
মায়ের হাতের ভাত খাওয়া হল না: রাত ৯টার দিকে দূর্জয়ের মা ভাত খেতে ডাকছিল তাকে। আর ভাত খাওয়ার প্রস্তুতিই নিচ্ছিল দূর্জয়। ঠিক সেই সময় এক বন্ধুর ডাক। মাকে বলল, ভাত পরে খাব। আমি আসছি। বেরিয়ে গেল বন্ধুর সাথে। দেড় ঘন্টা পরই খবর এল বাসচাপায় নিহত হয়েছে দূর্জয়। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পরে গেলেন মা। ছেলের ভাত না খাওয়ার শোক কোন ভাবেই ভুলতে পারছেন না হাবিবা বেগম।