বছরের পর বছর কষ্টের সীমা পেরিয়ে গেলেও মুক্তি মিলছে না। যেন এক নির্মম! উদাসীন, নিষ্ঠুরতা। যেন বাবা, মা, ছেলে মেয়েসহ চারপাশের সবারই গা সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে। বাঁশের খুটির শিকলটি যেন তার নিত্য সঙ্গী। সেখানেই কাঁটাতে হয় দিন-রাত থাকতে হচ্ছে বছরের পর বছর। দুর্বিষহ জীবনের বেদনার ছাপ। সেসব দুঃখ বেদনার কথাও প্রকাশের শক্তি হারিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন ময়না (৪০)। প্রায় ৭ বছর ধরে শিকল বন্দী হয়ে আছে পাগলি ময়না বেগম। ময়নার বৃদ্ধ বাবা ভ্যান চালিয়ে ৫ জনের সংসার চালায়। অথচ আজ পর্যন্ত একটি সরকারি ভাতার কার্ডও মেলেনি কপালে।
সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের রামনগর মধ্যপাড়া গ্রামের আব্দুল হালিমের মেয়ে ময়না এর সঙ্গে একই ইউনিয়নের রামেশ^রপুর এলাকার সামায়ন হোসেনের ছেলে আমিনুল ইসলামের সঙ্গে ১৫ বছর আগে বিয়ে হয়। সুখি সংসারে জন্ম নেয় ছেলে মুন্নাফ (৯) এরপর হঠাৎ ময়নার মাথা ব্যাথা শুরু হয়। কিন্তু স্বামী আমিনুল ইসলাম চিকিৎসা না করায় বাবার বাড়ীতে এসে চিকিৎসা করে ভালো হয় ময়না। সুখের সংসার করার জন্য আবার স্বামীর বাড়ীতে ফিরে যায়।
বিছুদিন যেতেই আবার শুরু হয় পাগলামী এরই মধ্যে জন্ম নেয় সুন্দরী নামের একটি মেয়ে সন্তান। এমতবস্থায় মাথার সমস্যা বেশি হয়, এ কারণে স্বামী আমিনুল ইসলাম তাকে তালাক দেয়। ২ মাসের শিশু সুন্দরীসহ বৃদ্ধ বাবার বাড়ীতে আসে ময়না। বৃদ্ধ বাবা কিছুদিন চিকিৎসা করালেও টাকার অভাবে ময়নার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়।
চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই ময়না পুরো পাগলি হয়ে যায়। তখন শরীরে আর কোন কাপড় না রেখে রাস্তা ও এলাকার মাঝে ঘুরতে থাকে। এমন অবস্থায় বাবা আব্দুল হালিম ও মা ছয়েদা বেগম কোন উপায় না পেয়ে বাড়ীতে এনে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। আর এই শিকল বাঁধা অবস্থায় পেঁরিয়ে গেছে ৭টি বছর। মেয়ে সুন্দরীর বয়স এখন সাত বছর। সুন্দরীর তেমন জ্ঞান, বুদ্ধি নেই। মাথার সমস্যা দেখা দিয়েছে। অর্থের অভাবে হয়তো আবার সুন্দরীকে শিকল বন্দি জীবন কাঁটাতে হতে পারে।
ময়নার মা ছয়েদা বেগম জানান, ময়না এখন সম্পূর্ণ পাগলি শরীরে কোন কাপড় রাখেনা। মেয়ে মানুষ এমন অবস্থায় বাহিরে ঘুরতে দেওয়া যায় না, তাই পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছি ৭ বছর হয়েছে। এই ৭ বছর ধরে এক জায়গায় খাওয়া ও প্রসাব-পায়খানা করে। আমি বৃদ্ধা কোমড় সোজা করতে পারিনা, তবুও কষ্ট করে এগুলো পরিষ্কার করি। সে আমার মেয়ে, তাকে মেরে ফেলতে তো পারবোনা।
ময়নার বাবা আব্দুল হালিম জানান, ময়নার মেয়ে সুন্দরীরও এখন একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। মাঝে মাঝে নাতনী সুন্দরীও হারিয়ে যায়। তাকে দ্রুত চিকিৎসা না করলে একদিন সুন্দরীও পাগলি হয়ে যাবে। এই বৃদ্ধ বয়সে ভ্যান চালিয়ে চালাতে হয় ৫ জনের সংসার। তাকে চিকিৎসা করাবো এই টাকা পাবো কোথায়। বার বার মেম্বরকে একটি সরকারি ভাতার কার্ড করার জন্য বলা হলেও আজও পাইনি।
গাড়ীদহ মডেল ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড মেম্বর হামিদুর রহমান সরকার জানান, পনেরদিন হয়েছে সরকারি ভাতার কার্ডের জন্য আমার কাছে এসেছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়েছি এখনো হাতে পায়নি।
গাড়ীদহ মডেল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান দবির উদ্দিন বলেন, আমার কাছে ময়নার বাবা ও মা কেউ এ সরকারি ভাতার জন্য আসেনি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ময়নুল ইসলাম জানান, আমি আপনাদের মাধ্যমে জানলাম, তাকে দেখতে যাবো এবং অতিদ্রুত সরকারি ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।