আজ থেকে ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সাল ৯ ডিসেম্বর। এ দিন পাক বাহিনীর দোসর ১৫৬ জন রাজাকারের আত্মসমর্পণ এবং জনগণের রায়ে সবাইকে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের মধ্যদিয়ে খুলনার পাইকগাছায় কপিলমুনি কে কলঙ্ক মুক্ত করেন মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম বর্তমান সরকার গ্রহণ করলেও ৫০ বছর আগে রায় সাহেবের বিশালাকৃতির বাড়িটি রাজাকাররা সুরক্ষিত দুর্গ হিসাবে বেঁছে নেয়। প্রাচিন ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িটি ঘিরে মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন আজও বহন করে চলেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। দীর্ঘ নয় মাস সম্মুখ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে খুলনা জেলার অন্যতম সুরক্ষিত এই রাজাকার ঘাঁটির পতন ঘটে। ১৫৬ জন রাজাকারদের মৃত্যুদন্ডের মধ্য দিয়ে কপিলমুনি কলঙ্ক মুক্ত করা হয়। অথচ রায় সাহেব বিনোদ বিহারি সাধু দানকৃত সম্পত্তির মধ্যে ৪৮ শতক (ভিপি 'ক') সম্পত্তির মাত্র ২৩ শতক জমির উপর
কপিলমুনি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণে বাধা প্রদান করছেন অবৈধ দখলদাররা। অন্যদিকে রায় সাহেবের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও সেই সম্পদগুলো এখন কতিপয় ব্যক্তি বিশেষের দখলে চলে গেছে। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা দখল করে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে আবাসনসহ ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান। বাজারের রাস্তা সম্প্রসারণে সরকারকে গচ্চা দিতে হবে কোটি কোটি টাকা। অথচ সরকার এই রাস্তার জায়গা উদ্ধার করলে রাস্তা প্রশস্ত সহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ সরকারের রাজস্ব খাতে আসবে বলে ধারণা করছেন অভিজ্ঞ মহল। একইভাবে যে মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, সেইসব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণে স্বয়ং বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক গত বছর ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনিতে এসে সরকারী খাস সম্পত্তিতে কপিলমুনি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজের শুভ উদ্বোধন করেন। ঐসময় উপস্থিত ছিলেন খুলনা-৬ সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান বাবু, জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তপন কান্তি ঘোষ। অথচ দুঃখের বিষয় রায় সাহেবের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ যারা বেআইনিভাবে ভূয়া কাগজপত্র সৃষ্টি করে জবর দখল করে রেখেছে তারাই মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স নির্মাণে বার বার বাধা দিচ্ছেন। দখল পাল্টা দখল খেলায় সর্বশেষ বুধবার কপিলমুনি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণে জায়গায় ঐ ভূমিদস্যুরা আবারো কাটা তারের ঘেরাবেড়া দিয়েছে। এমনকি নির্ধারিত সেই স্থানটি তাদের বলে দাবি করছেন। আর এই ঘটনার পর থেকে এলাকার সচেতন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে স্বয়ং মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সহ প্রভাবশালী দুইজন সচিব মহোদয় সরেজমিনে এসে সরকারি সম্পত্তিতে কমপ্লেক্স নির্মাণে সুমদয় প্রক্রিয়া শেষ করলেও সরকারি সম্পত্তি দাবিদার কে এই কথিত রায় সাহেব এর বংশধর? এ ব্যাপারে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, রায় সাহেবের লেখা আমার ব্যবসা জীবন বইতেও তিনি স্পষ্ট করে লিখে গিয়েছেন তার ভাই কুঞ্জবিহারী সাধুর বিরোধীতা সহ নানা অত্যাচারে তিনি একাধিকবার ভারতে চলে যান। এমনকি তিনি মনের দুঃখে একথাও লিখেছিলেন আমি এলাকার জন্য আরও অনেক কিছু করতে পারতাম। কিন্তু ভাইয়ের বিরোধিতার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন উৎকর্ষ সমিতির সামনের ফলকে তার বাণী লেখা আছে। তিনি লিখেছেন, তার সমুদয় সম্পত্তি জনহিতকর কাজে ব্যয় হবে। তার বংশধর কেউ এই সম্পত্তি দাবি করতে পারবে না। তাহলে প্রশ্ন উঠেছে? রায় সাহেবের সম্পত্তির দাবিদার কথিত এই বংশধরদের বৈধতা কি? তথ্যানুসন্ধানে আরো জানা যায়, ’৮০-এর দশক থেকে প্রথমে কপোতাক্ষ নদ ব্যাপক ভাঙন ও পরবর্তী পর্যায়ে নাব্যতা হ্রাসে কপিলমুনি সদরের কপোতাক্ষের তীর জুড়ে গড়ে ওঠে বিস্তীর্ণ চরভরাটি খাসজমি, যা সরকারের সর্বশেষ মানচিত্রে ১নম্বর খাস খতিয়ানের ৫৯৫ দাগে চিহ্নিত হয়। দাগের পাশেই এস.এ ১৯৩ খতিয়ানে ৪২৫, ৪২৬/৫৯৩ দাগে ননীবালা অধিকারী জমি এবং এস.এ ১৯২ খতিয়ানে ভিপি “ক” তালিকাভূক্ত ০.৪৮ একর জমি। নদের নাব্যতা হ্রাসে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে বর্ষা মৌসুমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একপর্যায়ে আন্দোলনের মুখে সরকার কপোতাক্ষ নদ খননের কাজ শুরু করেন। ওই সময় খননকৃত মাটি দুই পাড়ে ফেলায় কপিলমুনি অংশে দৃশ্যমান হয় বিস্তীর্ণ খাস জমির। আর সেই সুযোগে শুরু হয় প্রভাবশালীদের দখলপ্রক্রিয়া। সুযোগসন্ধানী রায় সাহেবের সম্পত্তি দখলে নিতে কৌশল হিসাবে তার বংশধর দাবি করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দখল প্রক্রিয়া সহ বেচাবিক্রির খেলা শুরু করে। অভিযোগ আছে, এদের নেপথ্যে সহযোগীতা করছে একটি প্রভাবশালী মহল। তারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স নির্মাণে বাধা প্রদান সহ দখলদারদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে যাবে ঐসব ব্যক্তিদের নেপথ্যের থলের বিড়াল। আর কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে পড়বে গর্তের সাপ।