স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে পাঁচ জনের সংসার মণিরামপুরের মধুপুর গ্রামের বাসিন্দা এজাজুল হক মধুর। গ্রামে একতলা ছাদের বাড়ি ও খাটুরা বাজারে সার ও মুদির দুটি দোকান রয়েছে তাঁর।
এজাজুল হকের দুই মেয়ের মধ্যে বড় জনকে বিয়ে দিয়েছেন যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় এবং ছোট মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন মণিরামপুরের উপজেলার দশানি কোলা গ্রামে। স্বামী সন্তান নিয়ে তার দুই মেয়ে থাকেন শ্বশুর বাড়িতে। ছোট জামাই থাকেন মালয়েশিয়ায়।
এই এজাজুল স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে মধুপুর এলাকায় ভূমিহীনদের তিনটি ঘর নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিজের বোন, ভাগ্নি ও ভাইয়ের মেয়ের নামেও ঘর নিয়েছেন তিনি। ঘরগুলো তালাবদ্ধ করে এই তিনজনের সবাই থাকেন শ্বশুর বাড়িতে।
একই পল্লীতে স্ত্রীর নামে ঘর পেয়েছেন ওসমান হোসেন নামের আরেক ব্যক্তি। যদিও বাবার ভিটায় ওসমানের রয়েছে ছাদের বসত ঘর। ওসমানের ঘরের পাশে পাঁচটি ঘর পেয়েছেন আলতাফ হোসেনের দুই স্ত্রী, দুই পুত্রবধূ এবং শ্যালিকা। আলতাফের দুই ছেলে চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। শ্যালিকাও থাকেন ঢাকাতে। ফলে ঘর তিনটি তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছে।
মণিরামপুর উপজেলার মধুপুর মৌজায় দুটি খাস জমিতে ভূমিহীনদের জন্য ৩৭টি ঘর নির্মিত হয়েছে। যেখানে দুই ব্যক্তির কব্জায় রয়েছে ১১টি ঘর।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রকৃত ভূমিহীন বাদ দিয়ে ছাদের বাড়ির মালিকের স্ত্রী ও মহিলা মেম্বরের ছেলের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ঘর। বাবার জমি থাকলেও ছেলেকে ভূমিহীন সাজিয়ে ঘর বিতরণ করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, হরিহরনগর ইউনিয়নের নায়েবসহ সংশ্লিষ্টরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে টাকার বিনিময়ে প্রাপ্য অধিকারহীন ব্যক্তিদের ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি। কাগজপত্র বা ব্যক্তির তথ্য সঠিকভাবে যাচাই না করে তারা এ কাজ করেছেন। এহেন কর্মকান্ডে সরকারের একটি মহৎ উদ্যোগ বিতর্কিত করা হয়েছে বলে মনে করেন এলাকাবাসী। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দ্রুত বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে ঘরগুলো বিতরণের দাবি করেছেন এলাকার সচেতন জনগন।
খ্ােজ খবর নিয়ে জানাযায়, আলতাফের ছোট স্ত্রী সাবানার নামের পাশে স্বামীর নাম ব্যবহার না করে কৌশলে বাবা ইউনুছ মোল্লার নাম দেওয়া হয়েছে। দুই ছেলেকে বাদ রেখে ব্যবহার করা হয়েছে পুত্রবধূ নাসরিন আকতার ও তাহেরা খাতুনের নাম।
ওই এলাকার সম্পদশালী আনোয়ার খাঁর দখলে ছিল বড় প্লটের সরকারি একটি খাস জমি। জমি দখলে থাকার সুবাদে সেখানে নির্মিত ২২টি ঘরের মধ্যে দুটি ঘর পেয়েছেন তার বড় ছেলে মোশারফ হোসেন এবং মোশারফের কিশোর ছেলে মনোয়ার হোসেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোশারেফের বাবার কয়েক বিঘা সম্পত্তি থাকলেও তাকে ভূমিহীন দেখিয়ে ঘর দুটি দেওয়া হয়েছে। ঘর দুটো তালাবদ্ধ করে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাবার ভিটায় থাকেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধুপুর গ্রামের এক ব্যক্তি বলেন, আমার ছাদের ঘর আছে। তাতে কী ! ২০ হাজার টাকা দিতি পারলি আমিও সরকারি ঘর পাতাম। টাকা খাইয়ে এসব ঘর দেওয়া হয়েছে।
এজাজুল হক মধু বলেন, অনেক আগে গ্রামের আব্দুর রহমান গোলদারের কাছ থেকে জমিটা কিনেছি। পরে সেই জমিতে বাড়ি করেছি। কাগজপত্র ঠিক না থাকায় তিনি আমাকে রেজিস্ট্রি করে দিতে পারেননি।
তিনি বলেন, ছাদের ঘরটা আমার হলেও জমিটা না। আমি প্রকৃত ভূমিহীন। আমার দুই মেয়ের নামে জমি না থাকায় তারাও ঘর পেয়েছে।
হরিহরনগর ইউনিয়নের (১, ২ ও ৩ নম্বর) ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মেহেরুননেছা বলেন, আমার স্বামীর জমি নেই। তাই ছেলে রবিউল ইসলাম একটা ঘর পেয়েছে।
হরিহরনগর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) শহিদুল ইসলাম বলেন, টাকা নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। যাদের নামে ঘর বরাদ্দ হয়েছে তাদের নামে কোনো জমি নেই। যাচাই-বাছাই করে ঘর দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হরিহরনগর ইউপি চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম জানান, ঘর পাওয়া ইজাজুলের ছাদের বাড়ি আছে কি না সেটা সঠিক জানা নেই। তবে যে জমিতে নতুন ঘর পেয়েছে ওই জমিটি দীর্ঘদিন ইজাজুলের দখলে ছিলো। সেই সূত্রেই ইজাজুল ঘর বরাদ্ধ পেয়েছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু আব্দুল্লাহ বায়োজিত-এর সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জাকির হাসান বলেন, জমি ও ভূমিহীন নির্বাচন করে দেন নায়েবরা। সেই অনুযায়ী ঘর দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।