সাতক্ষীরায় মাছের ঘেরের বেড়িবাঁধে সবজির মাচানে দোল খাচ্ছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ বিল সবুজ-সোনালি ধানের মিষ্টি গন্ধ হারিয়েছে অনেক আগেই। সেই জায়গা দখল করেছে সাদাসোনা খ্যাত চিংড়ির ঘের। বড় বড় বিলগুলো এখন আইল ঘেরা লোনা ও মিঠা পানির জলাশয়। সাতক্ষীরার কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) প্রচেষ্টায় বিগত কয়েকবছর ধরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মাছের ঘেরের বাঁধের পাড়ে সবজি চাষ। ‘সাথী ফসল’ হিসেবে শুরু হলেও এখন মূল ফসলের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে সমানে সমান। মাচায় বা ঘেরের আইলে সবজি আর নিচে পানিতে মাছ চাষ হচ্ছে। আর এখানে উৎপাদিত সবজি পুরোটাই বিষমুক্ত। ফলে, এর চাহিদাও রয়েছে দেশজুড়ে। জেলায় প্রতি বছর যে পরিমাণ সবজি উৎপাদন হয় তার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদিত হয় ঘেরের আইলে ও মাচা পদ্ধতিতে। ঘেরের আইলে সবজি চাষ লাভজনক হওয়ায় জেলার অধিকাংশ মৎস্য ঘেরে সবজির চাষাবাদ দিন দিন বাড়ছে। ফলে জেলায় সবজির চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলায়ও রপ্তানি হচ্ছে।
সাতক্ষীরা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) তথ্যমতে, চলতি বছর জেলার ৬৮১ হেক্টর জমির (মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধ) আইলে বিভিন্ন প্রকারের সবজি চাষ হয়েছে। জেলার মোট চাষকৃত মৎস্য ঘেরের জমির আইলে হেক্টর প্রতি গড় ১৯ মেট্রিকটন হারে সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৯৩৯ মেট্রিকটন। চলতি বছর সবচেয়ে বেশি সবজির চাষ হয়েছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায়। আর সবচেয়ে কম চাষ হয়েছে শ্যামনগর উপজেলার মৎস্য ঘেরের আইলে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ৩৩০ হেক্টর জমির (মৎস্য ঘেরের বাঁধ) আইলে সবজি চাষে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে হেক্টর প্রতি ৩০মেট্রিকটন হারে ৯ হাজার ৯৯০ মেট্রিকটন, তালা উপজেলায় ১৬৫ হেক্টর জমির আইলে হেক্টর প্রতি ২২ মেট্রিকটন হারে ৩৬৩০ মেট্রিক টন, কলারোয়ার ৫৫ হেক্টর জমির আইলে হেক্টর প্রতি ১৮ মেট্রিকটন হারে ৯৯০ মেট্রিকটন, আশাশুনিতে ৫৫ হেক্টর জমির আইলে হেক্টর প্রতি ১৭ মেট্রিকটন হারে ৯৩৫ মেট্রিকটন, কালিগঞ্জে ৪০ হেক্টর জমির আইলে হেক্টর প্রতি ১৬ মেট্রিকটন হারে ৬৪০ মেট্রিকটন, দেবহাটায় ২০ হেক্টর জমির আইলে হেক্টর প্রতি ১৪ মেট্রিকটন হারে ২৮০ মেট্রিকটন ও শ্যামনগরের মৎস্য ঘেরের ১৬ হেক্টর জমির আইলে সবজি চাষে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে হেক্টর প্রতি ১৪ মেট্রিকটন হারে ২২৪ মেট্রিকটন।
উপজেলাভিত্তিক সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ভিন্ন ভিন্ন থাকার সম্পর্কে মাটির গুণাগুণ ও লবণাক্ত ঘেরকে দোষারোপ করছেন কৃষি অধিদপ্তর। তবে জেলায় বিগত কয়েকবছর ধরে মৎস্য ঘেরের আইলে ‘বিষমুক্ত সবজি চাষ’ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ধান ও মাছের পাশাপাশি ঘেরে উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন জেলার কয়েক হাজার কৃষক।
জানা যায়, আইলে বিশেষ পদ্ধতিতে বাঁশ ও নেট দিয়ে ঝুলন্ত মাচা তৈরি করা হয়। তারপর বিষমুক্ত সবজির আবাদ করে বাড়ন্ত গাছ মাচার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে জায়গা কম লাগে ও অল্প পরিচর্যায় ভালো ফসল পাওয়া যায়। মৌসুমী ধান ও মাছ চাষ করে একসময় যাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটত, লাভজনক সমন্বিত সবজি চাষে এখন তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। এতে করে সমন্বিত এই চাষের দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই। সরেজমিনে সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া, দেবহাটাসহ বিভিন্ন অঞ্চলঘুরে দেখা যায়, জেলার অধিকাংশ মৎস্য ঘেরগুলোতে যতদূর চোখ যায় সবুজের সমারোহ। মাছের ঘেরের আইলে নির্মিত সারি সারি মাচায় ঝুলছে করলা, ঢেঁড়শ, পুঁইশাক, কুমড়া আর শসা। বর্ষাকালীন সবজির পাশাপাশি আগাম শীতকালীন সবজি চাষও শুরু করেছেন অনেকেই। সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়ক সংলগ্ন তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের মিঠাবাড়ি বিলে শতশত বিঘা জমির মৎস্য ঘেরে মাচা পদ্ধতিতে লাউ, কুমড়া ও করলার চাষ করা হয়েছে। মাচায় ঝুলছে হাজার হাজার করলা, শতশত লাউ ও কুমড়া। একই সাথে ঘেরের বেড়িবাঁধে লাগানো হয়েছে পুঁইশাক ও ঢেঁড়স। এ সময় নগরঘাটা ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামের জাফর সরদারের ছেলে ইসরাইল হোসেন জানান, আমি ১৬ একর জমিতে মৎস্য ঘের করেছি। তার তিন পাশে সবজি চাষ করেছি, যেখান থেকে সবজি পাওয়ার সময় চলে এসেছে। যদিও সবজি চাষ আমার মূল লক্ষ ছিলো না, তবে ঘেরের বেড়িবাঁধে সবজি চাষ করাটা অধিক লাভজনক। একারণে প্রতিবছরই আমি ঘেরের বেড়িবাঁধে সবজি চাষ করে থাকি।
তিনি আরও বলেন, আমার ১৬ একর জমির তিন পাশের সবজি চাষে সবমিলে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনূকুলে থাকলে ও বাজার দর ভালো পেলে আশাকরি আমি দেড় থেকে দুই লাখ টাকার সবজি বিক্রি করতে পারবো।
একই এলাকার অপর মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী মোহর আলী প্রায় এক একর জমিতে মৎস্য ঘেরের পাশাপাশি সবজি চাষ করেছেন। মাছের ঘেরের বেড়িবাঁধের চারপাশ দিয়ে ডাবল সিস্টেমে সবজির বেড়া দিয়ে সবজির মাচা দিয়েছেন তিনি। মোহর আলী বলেন, আমার লক্ষ্য মাছের ঘেরের সবজি থেকে ৫০হজার টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করা। এ সময় জেলার বিভিন্ন জায়গার সবজি চাষীদের সাথে কথা হলে তারা জানান, বর্তমানে দেশে ও বিদেশে সবজির ব্যাপক চাহিদা হওয়ায় গতকয়েক বছরে জেলার মৎস্য ঘেরের আইলে সবজি চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে মাছের ঘেরে মাচা পদ্ধতিতে সবুজ সবজির চাষ কৃষিতে নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেছে। তারা বলেন, মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষে বদলে গেছে তাদের মতো জেলার বহু কৃষকের ভাগ্য। তবে করোনা পরিস্থিতে সবজির বাজার দর নিয়ে চিন্তিত তারা। সবজির বাজার যেনো কোন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে সেজন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বাজার মনিটরিংয়ের দাবী জানিয়েছেন কৃষকরা।
এবিষয়ে সাতক্ষীরা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঘামারবাড়ির উপ-পরিচালক নুরুল হুদা জানান, জেলার অধিকাংশ ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ হচ্ছে। মাছের ঘেরের পাড়ে উৎপাদিত লাউ, উচ্ছে, শসা ও বরবটি ইতোমধ্যে জেলার বাজারগুলোতে আসতে শুরু করেছে। কৃষকেরাও ভালো দাম পাচ্ছেন। জেলার নিম্নাঞ্চলের মানুষের আয়ের একটা বিশাল অংশই এই ঘেরের পাড়ের সবজি চাষ থেকে আসে। একারণে আমরা কৃষকদের পাশে মাঠ পর্যায়ে সব সময় আছি। প্রান্তিক কৃষকদের সবজি বাগান পরিদর্শন করে তাদের সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহতও রাখবেন বলে জানান তিনি।
এবিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ন কবির বলেন, মৎস্য ঘেরের আইলে সবজি চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। তবে এ পরিবর্তনে যেনো কোন সিন্ডিকেট কাজ করতে না পারে সেজন্য কঠোর অবস্থানে থাকবে জেলা প্রশাসন। জেলার প্রান্তিক পর্যায়ের চাষীরা যেনো তাদের উৎপাদিত সবজির ন্যায্য মূল্য পায় সেজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিদিন বাজার মনিটরিং করা হবে। কোথাও কোন সিন্ডিকেট কাজ করলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।