হটলাইনে ফোন আসলেই অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ছুটছেন করোনায় আক্রান্ত রোগীর বাড়ি খুলনার রূপসা উপজেলার ৩নং নৈহাটী ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের সদস্য এস এম আলমগীর হোসেন শ্রাবণ (৩৬)। সে নিজেই রোগীর অক্সিজেন লেভেল মেপে নিজ হাতে পরিয়ে দিচ্ছেন অক্সিজেন মাস্ক। আবার সিলিন্ডারে অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলে তা রিফিল (পরিপূর্ণ) করার ব্যবস্থাও করছেন। তা আবার করছেন নিজ খরচে। এলাকায় সবাই তাঁকে আলম মেম্বর নামেই চেনেন। গত বছর করোনার সময় এলাকার গর্ভবতী মায়েদের জন্য পুষ্টিসেবা কার্যক্রম চালু করেছিলেন এই আলমগীর মেম্বর। করোনার কারণে যখন হাসপাতালগুলো বন্ধ ছিল তখন গর্ভবতী মায়েদের সঙ্গে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগাযোগ করিয়ে দিতেন। পরে তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী অর্ধশতাধিক অন্তঃসত্ত্বাকে সব ধরনের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও করেছিলেন। ওই সময় প্রতিদিন এলাকার প্রায় ৬০০ মানুষকে খিচুড়ি রান্না করে খাওয়াতেন এবং বাড়ি বাড়ি পৌঁছেও দিতেন এই আলমগীর মেম্বর। করোনায় আক্রান্তদের মৃতদেহ দাফনসহ সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালিয়েছেন এই জনপ্রতিনিধি। তাঁর এসব ভালো কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময় দেশের সুনামধন্য জাতীয় দৈনিক ও খুলনার বিভিন্ন আঞ্চলিক পত্রিকা গুলোতে প্রতিবেদনও হয়।
এ বছর গ্রামাঞ্চলে করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ায় প্রথম থেকেই বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজ শুরু করেন এই আলমগীর মেম্বর। সর্বশেষ গত মাসে রূপসা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অক্সিজেনের অভাবে কয়েকজন মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর গত ২৮ জুন কয়েকটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে গড়ে তোলেন ‘আলো ফুটবেই অক্সিজেন সেবা। এখন পর্যন্ত ২৫ জনকে এই অক্সিজেন সেবা দিয়েছেন পরোপকারী আলমগীর নামের এই ইউপি সদস্য। পাশাপাশি আবার চালু করেছেন গর্ভবতী মায়েদের জন্য পুষ্টিসেবা কার্যক্রম। ‘আলো ফুটবেই’ নামে আলমগীরের একটি সংগঠন রয়েছে। ওই সংগঠনের ব্যানারে প্রতিবন্ধীদের একটি স্কুল চালাতেন। কিন্তু করোনার কারণে তা প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ওই সংগঠনের ব্যানারেই স্বেচ্ছাশ্রমে বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করেন আলমগীর। বর্তমানে অক্সিজেন সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছেন পাঁচজন সদস্য। নৈহাটী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দিনমজুর আজগর আলী শেখ (৫২) ১৪ থেকে ১৫ দিন আগে জ¦রে আক্রান্ত হন। শুরুতে গুরুত্ব না দিলেও পরে করোনা পরীক্ষায় তাঁর রিপোর্ট পজিটিভ আসে। চার দিন আগে শ্বাসকষ্টও বেড়ে যায়। ব্যাপারটি জানানোর সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে সেই বাড়িতে চলে যান এই জনদরদী আলমগীর মেম্বর। আজগর আলীকে বাড়িতেই অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। আজগরের ছোট ভাই মো. হায়দার আলী শেখ বলেন, ‘জীবন-মরণের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। কিন্তু তারপরও সময়মতো আলমগীর মেম্বর অক্সিজেন নিয়ে না এলে ভাইয়ের অবস্থা যে কী হতো, তা বলা মুশকিল।’ আলমগীর হোসেন বলেন, গ্রামের মানুষ তুলনামূলক সচেতন কম। গায়ে জ¦র এলে বা করোনা উপসর্গ দেখা দিলেও খুব বেশি গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু যখন শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় তখন ছোটেন হাসপাতালে। তখন চিকিৎসকদের আর কিছু করার থাকে না। গ্রামের কয়েকজন মারা গেছেন এভাবেই। এরপর অক্সিজেন সেবা কার্যক্রম চালু করা হয়। কারও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে প্রাথমিকভাবে যেন তাঁকে বাঁচানো যায় সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নিজ ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ফোন এলেও ছুটে যাচ্ছেন আলমগীর ও তাঁর স্বেচ্ছাসেবকেরা। মাঝেমধ্যে পুলিশি ঝামেলাও পড়তে হচ্ছে। ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন শ্রাবণ বলেন, রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহোদয় এর কাছে স্বেচ্ছাসেবী কার্ড পাওয়ার জন্য মৌখিক ভাবে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু আমাকে কার্ড দেওয়া হয়নি।
তবে ইউএনও মোসাঃ রুবাইয়া তাছনিম বলেন, স্বেচ্ছাসেবী কার্ডের জন্য কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না, তা তিনি বলতে পারেননি। তিনি বলেন, যদি কেউ সত্যিই অক্সিজেন সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকেন তাহলে তাঁকে স্বেচ্ছাসেবী কার্ড দেওয়া হবে।