ঘুনিঝড় ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের পানিতে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে লোকালয়। পানি ঢুকেছে বাড়িঘরে। নিরুপায় হয়ে বেড়ীবাঁধে ঠাঁই নিয়েছে তারা। খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের গাঁতিরঘেরী এলাকার বাসুদেব দাশের গৃহস্থ পরিবার ছিল। মাছের ঘের ও অন্যান্য কাজ করে পরিবার নিয়ে বেশ সুখেই ছিলেন তিনি। কিন্তু গত ২৬ মে ইয়াসের জোয়ারের পানির চাপে তাঁর বাড়ীর পাশের শাকবাড়ীয়া নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। মুহূর্ত্বেই পানিতে তলিয়ে যায় সবকিছু। কিছু জিনিসপত্র রক্ষা করতে পারলেও অনেক কিছু ভেসে গেছে ঐ পানির তোড়ে। একদিন পর ভাটায় পানি নেমে যাওয়ার পর একটি নৌকায় করে ঘরের জিনিসপত্র ও মালামাল নিয়ে হরিহরপুর লঞ্চঘাট এলাকায় বেড়ীবাঁধের ওপর ঝুপড়ি বেঁধেছেন। শুধু বাসুদেব নয় বাসুদেবের মতো আরও কয়েকটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন ওই বাঁধের ওপর। আশ্রয় নেওয়া স্থানীয় অন্তরা রানী বলেন, ‘আইলার সময়ও জোয়ারের পানি এত বাড়েনি। ঝড়ের সময় প্রস্তুতি নিলেও ঘর ছাড়তে হতে পারে, তা কল্পনাও করিনি। এখন কোন রকমে মাথা গুঁজে আছি বাঁেধর উপর। বাঁধ মেরামত না হলে আর ঘরে ফেরা হবে না। গবাদী পশু আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে এসেছি।’ বাসুদেব দাশের মতোই অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন পদ্মপুকুর গ্রামের প্রায় ৬০টি পরিবার। আর এই তান্ডবে উপজেলার অন্তত্ব ২৬টি গ্রামের মানুষ। ঘরে খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, খাওয়ার পানিরও সংকট। সব মিলিয়ে আয়ের খোঁজে মানুষ ছুটছেন বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু সেখানেও ঠাঁই নেই। মানুষ পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন পুকুরপাড়, সড়কসহ বিভিন্ন উঁচু স্থানে। সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছে উপজেলার মহারাজপুর ও বাগালী ইউনিয়নের মানুষ। ঐ দুই ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের মধ্যে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা আসা-যাওয়া করছে। আধা পাকা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে। গবাদিপশু ও অন্যান্য আসবাব আশপাশের বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে রাখছে মানুষ। খাবার পানির উৎস পুকুর ও নলকূপগুলো নোনাপানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খাওয়ার পানির প্রচন্ড সংকটে পড়েছে মানুষ। কোনো ধরনের সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তাঁরা। এদিকে নোনাপানির প্রভাবে পুকুরের মাছসহ অন্যান্য জীব মরে গিয়ে এলাকায় ব্যাপক দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাদুর্ভাব ঘটেছে পেটের পীড়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগের। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট উচ্চ জোয়ারে উপজেলার বিভিন্ন স্থানের বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রায় ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। উপজেলার উত্তর বেদকাশীর গাাঁতীরঘেরী ও মহারাজপুরের দশহালিয়ার বাঁধ এখনো মেরামত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ঐ দুই ইউনিয়নসহ আশপাশের ইউনিয়নের গ্রামগুলোও প্লাবিত হচ্ছে। এর মধ্যে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের গাঁতিরঘেরী এলাকার শাকবাড়ীয়া নদীর ভাঙনে প্লাবিত হচ্ছে ঐ ইউনিয়নের গাঁতিরঘেরী, হরিহরপুর, পদ্মপুকুর ও চরামুখা গ্রাম। ঐ ভাঙনের পানি প্লাবিত করছে পাশের দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের বীণাপানি ও হলুদবুনিয়া গ্রামের কিছু অংশ। ইয়াসের প্রভাবে উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহারাজপুর ইউনিয়ন। ঐ ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে দশহালিয়া এলাকার কপোতাক্ষ নদের ভাঙনে প্লাবিত হচ্ছে লোকা, কালনা, মেঘারাইট, শিমলারআইট, খেজুরডাঙ্গা, আটরা, গোবিন্দপুর, দশহালিয়া, জয়পুর ও দেয়াড়া গ্রাম। এ ছাড়া প্লাবিত হচ্ছে কয়রা সদর ইউনিয়নের উত্তর মদিনাবাদের আংশিক ও বাগালী ইউনিয়নের বায়লহারানিয়া, শ্রিফলতলা, কলাপোতা, বাগালী, ঘুগরোকাটি, দক্ষিণ ঘুগরোকাটি, বামিয়া, ইসলামপুর, হোগলা ও শেওড়া গ্রাম। ঐ ইউনিয়নের পূর্ব দিকে মঠবাড়ি ও পবনা এলাকায় শাকবাড়িয়া নদীর ভাঙনে প্লাবিত হয়েছিল আরও অন্তত পাঁচটি গ্রাম। কিন্তু ঐ দুই জায়গার বাঁধ মেরামত করে দেওয়ায় এখন গ্রামগুলো আর প্লাবিত হচ্ছে না। বাগালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আঃ সাত্তার পাড় বলেন, এমন দুর্ভোগে আইলার সময়ও কেউ পড়েনি। পুরো ইউনিয়নের অন্তত চার ভাগের মধ্যে তিন ভাগ পানিতে তলিয়ে আছে। ঐ ইউনিয়নের কোনো স্থান থেকে বাঁধের ভাঙন হয়নি বলে জানান তিনি। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার জায়গা না পেয়ে খেজুরবুনিয়া পুকুরপাড়ের চারপাশে আশ্রয় নিয়েছে অন্তত ৩০টি পরিবার। অধিকাংশই পলিথিন দিয়ে খুপড়ি তৈরি করে কোনোরকমে সেখানে রয়েছেন। তাঁদেরই একজন আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন,প্রথম দিনই ঘরের মধ্যে কোমরসমান পানি ওঠে। ভাটার সময়ও থাকে হাঁটুপানি। পরদিন ঘর ভেঙে পড়ে। এরপর আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে সেখানে কোনো জায়গা পাওয়া যায়নি, তাই পুকুরপাড়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ঘরবাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেওয়া ওই মানুষগুলো জানান, তাঁরা এখনো কোনো খাদ্যসহায়তা পাননি। কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের আড়াই টন করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শুকনা খাবার কিনে বিতরণের জন্য দেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার করে টাকা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। একটি ভ্রাম্যমাণ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে খাওয়ার পানি সরবরাহ করছে বলেও জানান তিনি।