বাড়ির সবাই ভারতীয় ক্রিকেট দলের সমর্থক। ছোট্ট ছেলেটিও সবার সঙ্গে বসল টিভির সামনে। আকাশী-নীল জার্সি পরা ছোটখাটো গড়নের একজন ব্যাটসম্যান সেদিন গুঁড়িয়ে দিলেন হলুদ জার্সি পরা বোলারদের। শারজাহর ২২ গজে সেই ঝড় দেখে কক্সবাজারের বাসায় বসে নিজের হৃদয়ে স্বপ্নের ছবি এঁকে ফেলল এক বালক, ‘আমিও এরকম ক্রিকেট খেলব টিভিতে!’ মুমিনুল হকের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প এটিই। স্বপ্ন পূরণের পথ অবশ্যই সহজ ছিল না। অনেক বাধা আর প্রতিকূলতা পেরিয়ে, কঠোর পরিশ্রম আর ত্যাগ-তিতিক্ষার অনেক প্রহর শেষে তবেই নিজেকে সেই পর্যায়ে নিতে পেরেছেন, যখন তার খেলা দেখা গেছে টিভিতে। তবে স্বপ্নের বীজটা বোনা হয়েছিল ২২ বছর আগের সেই রাতে, ব্যাটিং তা-বে যখন অস্ট্রেলিয়ানদের তুলোধুনা করেছিলেন শচিন টেন্ডুলকার। বাংলাদেশের ক্রিকেটে যারা এই সময়ের নায়ক, বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে তাদের জীবনেও কেউ না কেউ ছিল নায়ক। তাদের নিয়েই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন, ‘নায়কদের নায়ক।’ এই পর্বে মুমিনুল হক শোনাচ্ছেন তার টেন্ডুলকার-প্রেমের উপাখ্যান। টেন্ডুলকারের ৪৭তম জন্মদিন শুক্রবার। ২২ বছর আগে, এমনই এক ২৪ এপ্রিলে ভারতীয় ব্যাটিং বিস্ময়কে প্রথম দেখেছিলেন মুমিনুল। তার স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল ১৯৯৮ সালের শারজা কাপের সেই ইনিংস।
‘টেন্ডুলকারের ব্যাটিং, টেন্ডুলকারের বিনয়, সবই আদর্শ’
“ বাংলাদেশ তখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত নয়। আমার বড় ভাই, বাসার সবাই ভারতের সমর্থক তখন। ভারতের খেলাই বেশি দেখা হতো। আমার প্রথম যে খেলা দেখার কথা মনে পড়ে, বয়স তখন ৭-৮ হবে, টেন্ডুলকার অনেক পিটিয়েছিল অষ্ট্রেলিয়ান বোলারদের।”
“ কেন জানি না, ডেমিয়েন ফ্লেমিংয়ের (সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার) চেহারাটা আমার বেশি মনে পড়ে তখনকার। মনে আছে, ফ্লেমিং বল করতেন আর টেন্ডুলকারের দুর্দান্ত শট দেখে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকতেন। খুব মজা পেয়েছিলাম, অনেক লাফিয়েছিলাম। আর হ্যাঁ, স্বপ্ন দেখেছিলাম। টেন্ডুলকারের ওই দিনের ব্যাটিং দেখেই মনে হয়েছিল, “আমাকেও টিভিতে খেলতে হবে, এরকম ব্যাটিং করতে হবে।”
“ টেন্ডুলকার যে সেঞ্চুরি করেছিলেন (১৩১ বলে ১৪৩) বা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস সেটি, অতকিছু তখন বুঝতাম না। শুধু তার চার-ছক্কা, দুর্দান্ত সব শট, দর্শকের লাফানো, অস্ট্রেলিয়ানদের বিধ্বস্ত করা, এসব মনে আছে। আজকে আমি যে ক্রিকেটার হয়েছি, যে পর্যায়েই এসেছি, সবকিছুর শুরু সেদিন থেকে। তিনিই আমার নায়ক। তাকে দেখেই আমি ক্রিকেটার হয়েছি।”
“ দুই দিন পর ফাইনালেও আবার একইভাবে অস্ট্রেলিয়ানদের পিটিয়ে ছাতু বানালেন (১৩১ বলে ১৩৪)। তখন আমি টেন্ডুলকার ছাড়া আর কিছু বুঝি না। যদিও আমি ছোট থেকেই বাঁহাতি, কিন্তু ব্যাটিং করতে চাইতাম টেন্ডুলকারের মতো। ওরকম মারতে চাইতাম, শট খেলতে চাইতাম। আমাদের বাসায় উঠোনের মতো জায়গা ছিল, সেখানে ভাইয়ের সঙ্গে খেলতাম। টেন্ডুলকারের মতো শট খেলতে গিয়ে কত জানালার কাঁচ ভেঙেছি, কত বল উড়িয়েছি!”
“ একটু বড় হয়ে পাড়ায় পাড়ায় যখন খেলা শুরু করলাম, তখনও টেন্ডুলকার হতে চাইতাম। ঘরে টেন্ডুলকারের পোস্টার লাগিয়েছিলাম। তাকে নিয়ে লেখা, তার ছবির পেপার কাটিং রাখতাম। পরে বিকেএসপিতে গেলাম, ততদিনে ক্রিকেট বুঝতে শুরু করেছি। টেন্ডুলকারের প্রতি ভালোলাগা তখন আরও বাড়তে শুরু করেছে। বুঝতাম যে ঠিক নায়ককেই পছন্দ করেছি আমি।”
“ আস্তে আস্তে আমি স্বপ্ন পূরণের পথে এগোতে থাকলাম। টেন্ডুলকারও নিজেকে আরও অনেক উঁচুতে নিয়ে গেলেন। খুব ইচ্ছে ছিল, তার বিপক্ষে খেলার। কিন্তু আমার আন্তর্জাতিক অভিষেক হতে হতে তার ক্যারিয়ার প্রায় শেষ। সেই সৌভাগ্য আমার আর হয়নি।”
“ তাকে প্রথমবার সামনাসামনি দেখলাম মাত্র কিছুদিন আগে। গত নভেম্বরে, কলকাতায় দিন-রাতের টেস্টের সময়। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেন্ডুলকারও ছিলেন উদ্বোধনে। তার সঙ্গে হাত মেলানো হয়েছে, হাই-হ্যালো হয়েছে। কিন্তু এত ঝামেলার মধ্যে আলাদা করে কথা বলার সুযোগ হয়নি। ছেলেবেলার ইচ্ছে ছিল, তার সঙ্গে ছবি তোলার। সেই শখও পূরণ হয়নি। হয়তো, অধিনায়ক না থাকলে সেদিন কথা বলতে পারতাম দিনের খেলা শেষে। কিন্তু খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলন ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকায় তার কাছে গিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়নি।”
“ টেন্ডুলকারের ব্যাটিং নিয়ে কথা বলতে চাইলে শেষ হবে না। আমার আরও ভালো লাগত, তার ভাবমূর্তি। এত বড় ক্রিকেটার, অথচ কত বিনয়ী! ব্যাট হাতে কত আগ্রাসী, অথচ মাঠে বা বাইরে বিতর্কিত কিছু করেননি খুব একটা। সেই ছোটবেলা থেকেই তাকে নিয়ে লোকের আগ্রহ, ক্যারিয়ারে এত জনপ্রিয়তা, শত কোটি মানুষের আশার ভার বয়ে বেড়ানো, সবসময় সবার কৌতূহলের কেন্দ্রে থাকা, সব মিলিয়ে তার মতো জায়গায় থেকে নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, এটা অবিশ্বাস্য। সব দিক থেকেই তিনি আদর্শ।”
“ কখনও নিশ্চয়ই আবার দেখা হবে তার সঙ্গে। কথা হবে। প্রথম কথাটিই বলব, ‘আপনার জন্যই আজ আমি ক্রিকেটার, আপনিই আমার নায়ক।’ অনেকেই অনেক সময় বলে থাকেন না যে, ‘কার সঙ্গে ডিনারে যেতে চান’ বা ‘কার সঙ্গে সময় কাটানোর স্বপ্ন দেখেন’, আমাকে জিজ্ঞেস করলে, উত্তরটি এখনও হবে ‘টেন্ডুলকার।’ ছেলেবেলার নায়ক আমার বড়বেলারও নায়ক।”