কজনই বা বেছে নেন আত্মসমালোচনার কঠিন পথ? আবুল হোসেন কঠিনেরেই ভালোবাসলেন! ফুটবলের তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করা এই কোচের কণ্ঠে শোনা গেল উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী উচ্চারণ। পাইনিওয়ার থেকে শুরু করে তৃতীয়, দ্বিতীয়, প্রথম বিভাগ ও চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ-ফুটবলার তৈরির এ পর্যায়ের নানা অভিযোগ ও সীমাবদ্ধতা যেমন জানালেন, তেমনি ফুটবলের আধুনিক কৌশল ও নতুনত্বের প্রতি অনেক কোচের প্রবল অনীহার স্বীকারোক্তিও দিলেন অকপটে। পাইওনিয়ার থেকে শুরু করে বিসিএল পর্যন্ত-ফুটবলাদের বেড়ে ওঠার এই পর্যায়ে সীমাবদ্ধতার শেষ নেই। মাঠ নেই। অর্থ নেই। সময়োপযোগী পরিকল্পনা নেই। বরং লেপ্টে আছে ম্যাচ গড়াপেটার কালি, ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার উদাসীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, স্বজনপ্রীতিও। ঘরোয়া ফুটবলের এই পর্যায়ের নানা সমস্যা ও সমাধানের পথ নিয়ে -এর সঙ্গে কথা বলেছেন একাধিক কোচ। তাদের কথায় উঠে এসেছে এ ধাপগুলোর নানা সাদা-কালো দিক। ধারাবাহিক এই আয়োজনে কোচ আবুল হোসেন কোচদেরই তুললেন কাঠগড়ায়। দিলেন সঙ্কট থেকে উত্তরণের পরামর্শও। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) অধীনে আবুল কাজ করছেন অনূর্ধ্ব-১৬ দল নিয়ে। কাজ করেছেন পাইওনিয়ার, তৃতীয়-দ্বিতীয় বিভাগ ও চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে। খেলার পাশাপাশি কোচিং চালিয়ে যাওয়ায় তার কোচিং ক্যারিয়ারের বয়সও ১৫ বছরের কাছাকাছি। ‘বি’ লাইসেন্সধারী আবুল তাই খুব কাছ থেকে দেখেছেন এই স্তরের কোচদের সীমাবদ্ধতা। ‘অনেক কোচ নতুনকে গ্রহণ করতে চায় না’ বাফুফের হিসাব অনুযায়ী লাইসেন্সধারী কোচের সংখ্যা ৩৮০ জন। ‘এ’ লাইসেন্স করা ৪৯ জন। ৬৬ জনের ‘বি’ এবং ২৬৫ জনের আছে ‘সি’ লাইসেন্স। পাইওনিয়ার থেকে বিসিএল পর্যন্ত উঠতি ফুটবলারদের নিয়ে কাজ করেন মূলত ‘সি’ ও ‘বি’ লাইসেন্সধারীরা। এই পর্যায়ে বছরের পর বছর কাজ করে যাওয়া লাইসেন্সহীন কোচের সংখ্যাও অনেক! গুরুত্বপূর্ণ এ ধাপগুলোর কোচদের অনেকে রপ্ত করতে চান না নতুন কৌশল। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে তাদের চরম অনাগ্রহ। ফরমেশন, বিল্ড-আপ, অ্যাটাকিং, ডিফেন্ডিং, শক্তি-দুর্বলতা অনুযায়ী ছক সাজিয়ে উঠতিদের গড়ে তোলা -এসব বিষয়ে আধুনিকতার বদলে অনেকে মান্ধাতার আমলের চিন্তায় মুখ গুঁজে থাকেন বলে জানালেন আবুল। “কোচদের মধ্যে যারা ‘সি’ বা ‘বি’ লাইসেন্স করেছে, তাদের অনেকে কোচিংয়ের নতুন এবং আধুনিক দিকগুলো গ্রহণ করতে চায় না। আগের যুগে থাকে। দশ চক্কর দিলাম, আগের ধাঁচে অনুশীলন করলাম-এগুলোতেই থাকতে চায়। যারা বাইরে থেকে আমাদের কোচিং করাতে আসে, তারা অনেক কিছু জেনে আসে। আমাদের অনেকে অনেক ধাপের লাইসেন্স করছে, কিন্তু কতটা কাজে কতটা প্রয়োগ করছে, সেটা একটু দেখলেই বোঝা যায়।” ইতিবাচক মানসিকতার ঘাটতি, ফুটবল শিক্ষার অভাবের কারণে উঠতি খেলোয়াড়দের অনেকের আধুনিক কৌশলের প্রতি বিমুখতা আছে বলেও জানালেন একসময় সাইফ স্পোর্টিংয়ে কাজ করা আবুল। “অনেক সময় খেলোয়াড়রাও নতুন বিষয়গুলো নিতে চায় না। তৃণমুল থেকে মেধাবী খেলোয়াড়ও কম আসে। নিজের পজিশন, কিভাবে খেলতে হবে, একজন স্ট্রাইকার-মিডফিল্ডারের কাজ, মাঠে কোন সময়ে কোনটা করা জরুরি-এগুলো বুঝতে চায় না।”
‘অনেক কোচ নতুনকে গ্রহণ করতে চায় না’
বাফুফের হিসাব অনুযায়ী লাইসেন্সধারী কোচের সংখ্যা ৩৮০ জন। ‘এ’ লাইসেন্স করা ৪৯ জন। ৬৬ জনের ‘বি’ এবং ২৬৫ জনের আছে ‘সি’ লাইসেন্স। পাইওনিয়ার থেকে বিসিএল পর্যন্ত উঠতি ফুটবলারদের নিয়ে কাজ করেন মূলত ‘সি’ ও ‘বি’ লাইসেন্সধারীরা। এই পর্যায়ে বছরের পর বছর কাজ করে যাওয়া লাইসেন্সহীন কোচের সংখ্যাও অনেক! গুরুত্বপূর্ণ এ ধাপগুলোর কোচদের অনেকে রপ্ত করতে চান না নতুন কৌশল। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে তাদের চরম অনাগ্রহ। ফরমেশন, বিল্ড-আপ, অ্যাটাকিং, ডিফেন্ডিং, শক্তি-দুর্বলতা অনুযায়ী ছক সাজিয়ে উঠতিদের গড়ে তোলা -এসব বিষয়ে আধুনিকতার বদলে অনেকে মান্ধাতার আমলের চিন্তায় মুখ গুঁজে থাকেন বলে জানালেন আবুল। “কোচদের মধ্যে যারা ‘সি’ বা ‘বি’ লাইসেন্স করেছে, তাদের অনেকে কোচিংয়ের নতুন এবং আধুনিক দিকগুলো গ্রহণ করতে চায় না। আগের যুগে থাকে। দশ চক্কর দিলাম, আগের ধাঁচে অনুশীলন করলাম-এগুলোতেই থাকতে চায়। যারা বাইরে থেকে আমাদের কোচিং করাতে আসে, তারা অনেক কিছু জেনে আসে। আমাদের অনেকে অনেক ধাপের লাইসেন্স করছে, কিন্তু কতটা কাজে কতটা প্রয়োগ করছে, সেটা একটু দেখলেই বোঝা যায়।” ইতিবাচক মানসিকতার ঘাটতি, ফুটবল শিক্ষার অভাবের কারণে উঠতি খেলোয়াড়দের অনেকের আধুনিক কৌশলের প্রতি বিমুখতা আছে বলেও জানালেন একসময় সাইফ স্পোর্টিংয়ে কাজ করা আবুল। “অনেক সময় খেলোয়াড়রাও নতুন বিষয়গুলো নিতে চায় না। তৃণমুল থেকে মেধাবী খেলোয়াড়ও কম আসে। নিজের পজিশন, কিভাবে খেলতে হবে, একজন স্ট্রাইকার-মিডফিল্ডারের কাজ, মাঠে কোন সময়ে কোনটা করা জরুরি-এগুলো বুঝতে চায় না।”
‘মাঠ নেই, অর্থ নেই ’
তৃতীয়-দ্বিতীয়-প্রথম বিভাগ ও বিসিএলের দলগুলোর অনুশীলনের জন্য নিজস্ব মাঠ নেই। এদিক-ওদিক করে যে মাঠের ব্যবস্থা করা যায়, তা দেখা যায় অনুশীলনের অনুপযুক্ত। কখনও আবার অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত সময় মেলে না বলে আক্ষেপ জানালেন আবুল।
“আসল প্রতিবন্ধকতা আমাদের গাইড লাইন নেই। ক্লাবের মাঠ নেই। টেন্ট নেই। মাঠ যা থাকে, অবস্থা খুবই খারাপ। যদি আমরা কোনো প্ল্যানিং বা সিডিউল করি যে, এভাবে আমরা অনুশীলন করব, দেখা যায় মাঠের জন্য করতে পারি না। ধরুন, কমলাপুরে অনুশীলন করতে গেলাম, তখন আরও দশটা দল এলো। তখন কারও সিডিউল মেলে না।”
“এই পর্যায়ের ক্লাবগুলোর আয়-উন্নতি নেই বললেই চলে। ডোনাররা দেয়। একটা ক্লাবে ২৫-৩০ জন খেলোয়াড় রাখা, খাওয়ানো, কোচ-স্টাফদের বেতন দেওয়া চাট্টিখানি কথা না। যদি বলি এই দলটাকে একটা শেপে আনতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ লাগবে, ক্লাব কর্মকর্তারা বলেন, যদি চার-ছয় সপ্তাহ দেইৃ. লিগ তিন-চার মাসে শেষ হয় কিনা জানি না। এত সময় দল টানা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়।”
নজর দিতে হবে তৃণমূলের খেলোয়াড় ও কোচের দিকে’
খেলোয়াড় তৈরির প্রথম ধাপ জেলা পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার দাবী আবুলের। এই ধাপে কোচদেরকেও আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিভিন্ন পর্যায়ে, আজমপুর ফুটবল ক্লাব উত্তরার, মাতুয়াইয়াল উদয়ন সংসদ, মুগদা সমাজ কল্যাণ সংসদ, শান্তিনগর ক্লাবে কাজ করা এই কোচ। “তৃণমুলে যারা কোচিং করায়, বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে, তারা ভালো না করলে ফুটবল কখনও এগোবে না। তাদেরকে আরও উন্নত, দক্ষ এবং যুগোপযোগী হতে হবে। তাদের জন্য কর্তৃপক্ষকেও কাজ করতে হবে। তৃণমুলের কোচরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, তাদের হাত ধরে প্রথম ফুটবলাররা উঠে আসে। আধুনিক হতে হবে আমাদের পর্যায়ে যারা কাজ করে তাদেরও।” এই ধাপের প্রতিযোগিতাগুলো জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার বলেও মনে করেন আবুল। প্রত্যাশা করেন সামর্থ্যবানরাও হাত বাড়াক ফুটবলের সার্বিক উন্নতিতে। “এছাড়া আমাদের প্রতিযোগিতাগুলো ঢাকা ভিত্তিক। জেলা পর্যায়ে যদি আরও প্রতিযোগিতা হয়, সেখান থেকে আরও অনেক ভালো খেলোয়াড় উঠে আসবে। জেলা পর্যায়ে কি কারও টাকা নেই? স্পন্সর করার মতো সামর্থ্যবান নেই? তারা যদি একটু এগিয়ে আসেন, তাহলে ফুটবলের উন্নতি না হয়ে পারেই না।”