মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলায় ক্যালেন্ডার বিক্রির নামে চলছে অভিনব চাঁদাবাজি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকদের টার্গেট করে এ চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। বাদ পরছেন না সাধারণ মানুষও। ওই ক্যালেন্ডারে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রীর ছবিসহ স্থানীয় এমপি আসম ফিরোজের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এক পৃষ্ঠার ওই ক্যালেন্ডারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ টাকা।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১ মার্চ আসম ফিরোজ এমপি ওই ক্যালেন্ডারের মোড়ক উম্মোচন করেন এবং সকলকে ক্যালেন্ডার ক্রয় করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী এ উপজেলায় ২৩৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৬০ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬৯টি মাদ্রাসা ও ১২টি কলেজের প্রধানদের মাঝে ক্যালেন্ডার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় দলীয় নেতাদের মাধ্যমে এই ক্যালেন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে।
ক্যালেন্ডারের ওপরের অংশে ডান পাশে বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত জন্মশতবার্ষিকীর মনোগ্রাম রয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসহ বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত তুলে ধরা হয়েছে। এর নিচে ডান পাশে শেখ হাসিনা ও আসম ফিরোজ এমপির ছবি রয়েছে। একটি ডিজিটাল ছাঁপাখানার মালিক বলেন, একটি ক্যালেন্ডার ছাপাতে সর্বোচ্চ ৮ থেকে ১০ টাকা খরচ হয়েছে। দলীয় ও প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ এবং মাদরাসার শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ক্যালেন্ডার বিক্রির জন্য একটি প্রধান কমিটিসহ ২১টি উপকমিটি গঠণ করা হয়েছে। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে ৬১ সদস্য বিশিষ্ট প্রধান কমিটির সভাপতি হলেন স্থানীয় এমপি আসম ফিরোজ এবং সদস্য সচিব হলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মোতালেব হাওলাদার।
প্রত্যেক ইউনিয়ন ও পৌরসভার জন্য ৩১ সদস্য বিশিষ্ট পৃথক ১৬টি উপকমিটি রয়েছে। এছাড়াও প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদরাসা ও কলেজের জন্য রয়েছে পৃথক চারটি উপকমিটি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্যালেন্ডার বিক্রি উপকমিটির প্রধান হলেন মদনপুরা বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক ও বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির বাউফল উপজেলা শাখার সভাপতি এসএম রেজাউল করিম। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান হলেন ছিটকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মরিয়ম বেগম নিসু, কলেজ উপকমিটির প্রধান হলেন বাউফল সরকারী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক রফিকুল ইসলাম। মাদরাসা উপকমিটির প্রধান হলেন কালাইয়া রব্বানিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এএসএম আবদুল হাই।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপকমিটির সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মাদরাসায় ক্যালেন্ডার বিক্রির জন্য পাঁচ হাজার করে মোট ১৫ হাজার ক্যালেন্ডার উপকমিটির কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। তারা শিক্ষকদের কাছে একটি থেকে তিনটি পর্যন্ত ক্যালেন্ডার বিক্রি করছেন। ১২টি কলেজের শিক্ষকদের কাছে বিক্রির জন্য তিন হাজার ক্যালেন্ডার উপকমিটির কাছে সরবরাহ করা হয়েছে।
সূত্রমতে, ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় বিক্রির জন্য ১৬টি উপকমিটির কাছে ৩২ হাজার ক্যালেন্ডার বিক্রির জন্য সরবরাহ করা হয়েছে। ক্যালেন্ডার ছাপানো হয়েছে মোট ৫০ হাজার। এই ক্যালেন্ডার ছাপাতে ৮ থেকে ১০টাকা করে খরচ হলে মোট খরচ হয়েছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। আর প্রতিটি ক্যালেন্ডার ৫০টাকা করে বিক্রি করায় আদায় হবে ২৫ লাখ টাকা। লাভ হবে ২০ লাখ টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক নেতৃবৃন্দরা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্থানীয় এমপি আসম ফিরোজের ছবি ব্যবহার করে ক্যালেন্ডার বিক্রির ঘটনাটি অভিনব চাঁবাজি। তারা আরও বলেন, নিজ অর্থে ক্যালেন্ডার ছাঁপিয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করা হলেই প্রমানিত হতো সত্যিকারভাবে বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করা হচ্ছে। এখন যা করা হচ্ছে তাতে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকে বিক্রি করা হচ্ছে। এটা কখনোই মুজিব আদর্শের সৈনিকেরা মেনে নিতে পারছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানশিক্ষক বলেন, আমাকে একশ’ ক্যালেন্ডার দিয়ে বলা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে। তাই আমার সহকারী শিক্ষক ও কর্মচারীর মধ্যে দুটি থেকে তিনটি করে ক্যালেন্ডার বিক্রি করেছি।
এ ব্যাপারে প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্যালেন্ডার বিক্রির উপকমিটির আহ্বায়ক উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি এসএম রেজাউল করিম রেজা, মাধ্যমিক বিদ্যালয় উপকমিটির আহবয়াক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মরিয়ম বেগম নিসু, কলেজ উপকমিটির আহ্বায়ক ও বাউফল সরকারী কলেজের বাংলা বিষয়ের প্রভাষক মোঃ রফিকুল ইসলাম এবং মাদরাসা উপকমিটির আহ্বায়ক ও কালাইয়া রব্বানিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এএসএম আবদুল হাই’র সাথে যোগাযোগ করা হলে, তারা সবাই ক্যালেন্ডার নিয়েছে বলে জানিয়েছেন। তবে কাউকে ক্যালেন্ডার নিতে বাধ্য করা হচ্ছেনা। যারা নিতে আগ্রহী কেবল তাদের কাছেই ক্যালেন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন।