বরেন্দ্র অঞ্চল নামে পরিচিত রাজশাহীর তানোর উপজেলা। এই উপজেলায় গত কয়েক বছর থেকে ভূ-গর্ভে পানির সমস্যা বেড়ে যাবার কারণে বোরো আবাদের পরিবর্তে চাষিরা গমের আবাদকে বেছে নিয়েছেন। একারণে এঅঞ্চলে বিশেষ করে উঁচু এলাকায় কৃষকদের কাছে গমের আবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গম চাষে অল্প খরচ হয় বলে অনেক কৃষক ধানের পাশাপাশি এখন গমকে বেছে নিয়েছেন। কৃষকরা গম চাষে সফলতা অর্জনও করেছেন।
ফলে এবারও রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিস্তৃত ফসলের মাঠ জুড়ে গমের চাষবাদ করেছেন চাষীরা। চাষাবাদের শুরুতে গম গাছের চেহারা ভালো থাকলেও শেষ মুহুর্তে এসে জাব ও মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। একারণে গমের ক্ষেত প্রায় নষ্ট হতে বসেছে। ফলে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এ অবস্থায় স্থানীয় কৃষি অফিসের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
তথ্যানুন্ধানে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌর এলাকায় ১ হাজার ২শ হেক্টর জমিতে গমের চাষাবাদ করা হয়েছে। এবার এই এলাকার কৃষকরা তাদের নিজ উদ্যোগে উচ্চ ফলনশীল বারী গম ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ এর চাষাবাদ করেছেন। কিন্তু সরকারি কৃষি প্রনোদণা তাদের ভাগ্যে জোটেনি। কৃষি অফিস বিনামূল্যের গমের বীজ কাউকে দেননি। তবে, ডিএপি ও পটাশ সার ৩ জন কৃষক মিলে ২০ কেজি দেয়া হয়। তবুও কৃষক তাদের সাধ্যমত গমের চাষাবাদ করেছেন। তবে, কৃষি অফিসারের উদাসিনতায় মৌসুম শেষের পথেও এখনও পর্যন্ত গম চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে পারেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার কলমা, বাঁধাইড় ও পাঁচন্দর ইউনিয়ন ছাড়াও বেশ কিছু এলাকায় প্রতি বছরের ন্যায় এবারও গমের চাষাবাদ আশানুরূপ হয়েছে। কিন্তু গমের শীষ বেরুনোর পর প্রায় জমিতে জাব পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে। আবার কিছু জমিতে মাজরা পোকার আক্রমণে শীষ সাদা হয়ে গেছে। আবার অনেক স্থানে ২/৩ শতক জমির গম কাঁচা অবস্থায় পোকার আক্রমনে মারা গেছে।
এনিয়ে উপজেলার বাঁধাইড় ইউনিয়নের তেলোপাড়া গ্রামের কৃষক দুরুল হুদা জানান, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও অন্যের সাড়ে ৩ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বোরো চাষের পরিবর্তে অল্প খরচে গম চাষবাদ করেছেন। সরকার থেকে প্রনোদনা হিসেবে ডিএপি ও পটাশ মিলে ১৫ কেজি সার ও ১ কেজি শরিষা বীজ পেয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে জানান, গমের চাষাবাদ করে শুধু ১ কেজি শরিষা বীজ পেয়েছেন। তার নামে বরাদ্দকৃত গমের বীজ দেয়া হয়নি।
তিনি আরও জানান, শুরুতে গমের আবাদ ভালই হয়েছিল তার। বেশ কয়েকদিন আগে গমের শীষ বেরুনোর পর শুরু হয় পোকার আক্রমণ। ফলে দুরুল হুদার স্বপ্ন অনেকটা দুঃস্বপ্নতে পরিণত হয়েছে। শেষ মুহুর্তে শীষ ফোটা গমে জাব পোকার আক্রমণে পুরো গমের ক্ষেত বিবর্ণ হচ্ছে। স্থানীয় বিএস খুঁজে না পাওয়ায় কীটনাশক ডিলারের পরামর্শে বেশ কয়েক বার ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। তবুও থামছে না পোকার আক্রমণ বলে জানান তিনি। একই কথা জানান ওই গ্রামের মনিরুল ইসলামসহ আরও অনেকে।
এনিয়ে ওই এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল আলম বলেন, এসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি অবগত নন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তথ্য দেবেন বলে মোবাইল সংযোগ বিছিন্ন করেন তিনি। তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামিমুল ইসলামের ০১৭২০-৪৩৭৮২৮ নম্বর মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও রিসিভ হয়নি। তবে, এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শামছুল হক বলেন, এই সময়ে গমে জাব পোকা লাগতে পারে। কিন্তু বেশি সময় থাকে না। দুয়েকবার কীটনাশক প্রয়োগে ভাল হয়। কৃষি পরামর্শে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফোন রিসিভ না করার কোন কারণ নেই। আমি বলে দিচ্ছি বলে জানান তিনি।
প্রশান্ত কুমার সরকার জানান, গমে মাজরা পোকার (ব্যালকাঠির) আক্রমণ কিছু ক্ষেতে দেখা দিয়েছে। এ পোকার আক্রমণ থেকে পরিত্রান পেতে চাষীদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তবে, এতে উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রায় কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এরাকার গৌরাঙ্গপুর গ্রামের কৃষক মাসুদ রানা এবার ৩০ বিঘা জমিতে গমের চাষ করেছেন। তার মধ্যে প্রায় ৭/৮ বিঘা জমির গম ওই মাজরা পোকার (ব্যালকাঠির) আক্রমণে বেরুনো শীর্ষ একই ভাবে সাদা হয়ে জমির মধ্যেই মরে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি কয়েক বার কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিতে গেলেও স্থানীয় কৃষি বিভাগ তার কথার কোনো কর্ণপাত করেন নি। ফলে তার ধার দেনা করা টাকা দিয়ে গমের চাষাবাদ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।
শুধু ইব্রাহীম হোসেন ও মাসুদ রানা নয় এবার রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, রহণপুর ও নওগাঁর নিয়ামতপুর, মান্দা এবং পোরসাসহ বৃহত্তম বরেন্দ্র অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমির গম শেষ মুহুর্তে মাজরা পোকার (ব্যালকাঠির) আক্রমণে কাঁচা অবস্থায় মরে যাচ্ছে। এতে হাজার হাজার কৃষক দিশে হারা হয়ে পড়েছেন।
রাজশাহী কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী এবার রাজশাহী অঞ্চলে গমের লক্ষ্য মাত্রা ২৪ হাজার ছাড়িয়ে তা চাষাবাদ করা হয়েছে ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে। তবে রাজশাহীর তানোর উপজেলায় এবার লক্ষ্য মাত্রার ১২শ হেক্টর ধরা হলেও দ্বিগুণ জমিতে গমের চাষাবাদ করা হয়।