আলতাফের সুখের সংসার। সর্বনাশা গুজবে মুহুর্তেই সেই সংসার তছনছ। গুজবের শিকার উপার্জনক্ষম একমাত্র সন্তান হারিয়ে আলতাফ দিশেহারা। সংসারের অভাব-অনটন তার নিত্যদিনের সঙ্গী। এমনকি তার দু’মুঠো আহার পর্যন্ত জোটেনা।
সমাজে এক শ্রেণীর লোক আছে যারা দেশের ভালো চায়না। সবসময় দেশকে অস্থির দেখতে চায়। বারবার সুযোগ খোঁজে কিভাবে গুজব ছড়ানো যায়। এসব নরপশুর কাছে গুজব যেন বিশৃঙ্খলা তৈরির তাবিজ। আর সেই তাবিজে রয়েছে দেশ ধ্বংসের মহাপরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।
কয়েক বছর আগে গুজব ছড়ানো হলো কৃমিনাশক ট্যাবলেটের নামে বিষাক্ত ওষুধ দিয়ে শিশুদের মেরে ফেলা হচ্ছে। তা নিয়েই পুরোদেশজুড়ে শুরু হয় হৈ চৈ। স্বাস্থ্য বিভাগের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো। এর কিছুদিন পরেই গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় দন্ডপ্রাপ্ত এক রাজাকারকে নাকি চাঁদে দেখা যাচ্ছে! মুহুর্তে উত্তেজিত করা হলো সাধারণ মানুষদের, ভাংচুর করা হলো থানা কাচারি, অফিস আদালত, বাড়িঘর। এমনকি অগ্নিসংযোগ পর্যন্ত করা হলো। গুজবের বলি হলো পুলিশসহ ১৪ জন। আহত দুই শতাধিক। সম্পদের ক্ষতি হলো শত শত কোটি টাকার।
এভাবে গুজব রটিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণে মাথা ও বাড্ডায় ছেলে ধরা সন্দেহে মাকে পিটিয়ে হত্যার মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এসব গুজব থেকে রেহাই পেতে দরকার সমাজকে সচেতন করা। এজন্য স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার মফস্বল ইনচার্জ মীর লিয়াকত আলী লিখেছেন ‘গুজবের তাবিজ’ নাটক।
বগুড়ার আমতলী মডেল ফাউন্ডেশনের ব্যানারে তৈরি এ নাটকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধে রাজাকারদের কু-কীর্তি। এটি দেখা যাবে amtoli model school নামের ইউটিউবে।
সত্য ঘটনার ওপর দর্শকনন্দিত একটি ডকু ড্রামা ॥ ডকুমেন্টারি (ডকু) ড্রামার নতুন আঙ্গিক-সমাজ ভাবনা ও সমাজ সচতেনতার একটি সৃজনশীল নাটক ‘গুজবের তাবিজ’। কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মান্ধ মানুষের মিথ্যা প্রচার কিভাবে সাধারণ মানুষকে বিপাকে ও বিপথে পরিচালিত এবং দেশের স্থাপনার ক্ষতি করে তার একটি দৃষ্টান্ত এই নাটক। ২৫ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডের নাটকটি গুজবের কয়েকটি সত্য ঘটনার ওপর নির্মিত। আমতলি মডেল ফাউন্ডেশন এই নাটকের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। যা ইউটিউবে আমতলী মডেল স্কুলের নিজস্ব চ্যানেলে মুক্তি পেয়েছে। নাটকটির বিষয় সাধারণের গ্রহণ যোগ্যতা পেয়ে দর্শকনন্দিত হয়েছে। মীর লিয়াকত আলীর কাহিনি ও নাট্যচিত্র বিন্যাসে ছবিটি পরিচালনা করেছেন কাইউম খান।
ছবিতে কাহিনীর গুরুত্ব অনুভবে তারুণ্যের চেতনা জাগাতে মহান মুক্তিযুদ্ধকে উপস্থাপন করা হয়েছে। যাতে প্রজন্ম কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার জাল থেকে বের হয়ে আসতে পারে। পরিচালক শিক্ষামূলক এই বিষয়টি নাটকের মধ্যে তারুণ্যের চেতনা জাগাতে তুলে ধরেছেন।
গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ব্যাংকার আলতাফ। যার পরিবার গুজবের শিকার হয়ে সন্তানকে হারিয়েছেন। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন থিয়েটার কর্মী সাজু আহমেদ। তার চরিত্র ঘিরেই একে একে এসেছে ঘটে যাওয়া গুজব ও কুসংস্কারের ভয়াবহতা কী হতে পারে। নাটকের গল্পের ধারা সূচিত হয়েছে বছর কয়েক আগে বগুড়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের টিকাদান কর্মসূচীতে শিশু মৃত্যুর মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে ভাংচুরের ঘটনা নিয়ে। এক কান থেকে দশ কান হয়ে সাধারণ মানুষ না বুঝেই হামলা করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
তারপর ২০১৩ সালের ৩ মার্চ বগুড়া থেকে শুরু হওয়া গুজব দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখার ভয়াবহতা সৃষ্টি নিয়ে। এরপর পদ্মা সেতু নির্মাণে ‘মাথা’ গুজব, ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষার্থীর মাকে গুজব রটিয়ে হত্যার বর্ণনা।
তরুণরা ভুল বুঝতে পেরে লাঠি ফেলে দিলে সাজু গুজব সৃষ্টিকারীদের প্রতিহত করতে বলেন। এ সময় পুলিশের একজন কর্মকর্তা আইন নিজের হাতে না তুলে গুজব সৃষ্টিকারীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে বলেন। নাটকের শেষে গণশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের সাক্ষাতকার নেয়া হয়।
র্যাব-৪’র কমান্ডার অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক গুজব ও কুসংস্কার থেকে সতর্ক থাকার আহবান করেন। যে চিত্রায়ন নাটককে বিশ^াস যোগ্যতা এনে দিয়ে দিয়েছে। নাটকটি সমাজ সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল চিত্র। যেখানে সত্য ঘটনা তুলে ধরে সচেতন করা হয়েছে।