দীর্ঘ সময়ের নিরবতা কাটিয়ে হঠাৎ করেই সাতক্ষীরা জেলায় বিএনপির রাজনীতিতে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। শীর্ষ স্থানীয়দের দৃশ্যমান রাজনীতিক তৎপরতায় সাতক্ষীরার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কর্মী সমর্থকদের মাঝেও ফিরেছে উম্মাদনা। নিস্ক্রিয়তা ভেঙে জেলা ও উপজেলা নেতৃবৃন্দের সরব পদচারণা বিএনপির ঘুরে দাড়ানোর ইঙ্গিত বলে কর্মী সমর্থকদের দাবি।
উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড বিএনপির নেতাদের সাথে জেলা নেতৃবৃন্দের আনুষ্ঠানিক ম্যারাথন মতবিনিময় সভার পর থেকে কর্মী সমর্থকরাও রীতিমত উজ্জীবিত। ফলে কিছুদিন আগেও সাংগঠনিক অচলাবস্থার মধ্যে আটকে থাকা সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে বিএনপির রাজনীতির চাকা আবারও সচল হয়েছে।
উল্লেখ্য সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গত ১৮ থেকে ২৬ জানুয়ারি জেলার দুটি পৌরসভাসহ সাত উপজেলা বিএনপি নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় সভায় অংশ নেয়। টানা নয় দিনের কর্মসুচিতে প্রতিটি উপজেলার পাশাপাশি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড বিএনপিসহ অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানিয়ে তৃণমুলের অভাব অভিযোগ এবং আশা আকাংখার বিষয়ে উম্মুক্ত আলোচনা করেন।
তালা উপজেলা, কলারোয়া উপজেলা ও কলারোয়া পৌর বিএনপি নেতারা মতবিনিময় সভায় অনুপস্থিত থাকলেও বাকি ছয়টি ইউনিট যথারীতি সভায় অংশ নেয়। লম্বা বিরতির পর প্রকাশ্য সভায় অংশ গ্রহণের পাশাপাশি তৃণমুল নেতা-কর্মীদের কথা বলার সুযোগ মেলায় নেতা-কর্মীরা রীতিমত উচ্ছ্বসিত।
সভায় উপস্থিত নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা জেলা উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড বিএনপিকে ঢেলে সাজানোর দাবি জানিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সর্বাত্ত্বক কর্মসূচি দেয়ার অনুরোধ করেন। দলীয় চেয়ারপার্সন কারাগারে থাকার পরও যেসব নেতা সরকার দলীয়দের সাথে গোপন আতাঁত করে পদ আঁকড়ে রয়েছে তাদের সরিয়ে প্রমাণিত ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের হাতে নেতৃত্ব দেয়ারও দাবি জানান উপস্থিত নেতৃবৃন্দ।
মতবিনিময় সভার অংশ হিসেবে ১৮ জানুয়ারি শ্যামনগর উপজেলা, ১৯ জানুয়ারি দেবহাটা উপজেলা, ২০ জানুয়ারি সাতক্ষীরা পৌরসভা এবং ২১ জানুয়ারি সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নেতৃবৃন্দ জেলা বিএনপি নেতাদের সাথে বৈঠকে অংশ নেয়। এ ছাড়া ২২ জানুয়ারি আশাশুনি উপজেলা এবং ২৩ জানুয়ারি কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সাথে মতবিনিময় করেন জেলা নেতৃবৃন্দ।
এর আগে তৃণমুল নেতা-কর্মীদের সাথে নির্ধারিত মতবিনিময় সভা ফলপ্রসূ এবং নেতা-কর্মী সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে বেশ কয়েকদিন ধরে দৈনিক পত্রিকাসমুহে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচারনাও চালানো হয়। প্রায় এক সপ্তাহ আগে হতে উপজেলা ও পৌর বিএনপির সভাপতি সাধারণ সম্পাদকদের চিঠি দিয়ে জেলা বিএনপি আহূত নির্ধারিত মতবিনিময় সভায় সর্বস্তরের নেতাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহবান জানানো হয়।
সাতক্ষীরা জেলাসহ বিভিন্ন উপজেলা বিএনপি এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠন সূত্রে জানা গেছে তৃণমুল নেতাদের সাথে মতবিনিময়ের পর থেকে মূলত সাতক্ষীরাতে আবারও বিএনপির রাজনীতি সরগরম হতে শুরু করেছে। বিএনপির “দুর্গ” খ্যাত উপকুলীয় এ জনপদজুড়ে বিএনপি এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও ফিরে এসেছে প্রাণ চাঞ্চল্য।
সভা সূত্রে জানা গেছে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা কোনো কোন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন এবং উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলে দ্রুত ঐসব কমিটি বিলুপ্ত করে তা পুনর্গঠনের দাবি জানায়। শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান ও চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ বিশ^াস আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন উল্লেখ করেন স্ব স্ব উপজেলা নেৃতবৃন্দ। একইভাবে শ্যামনগরের সভাপতি আবদুল ওয়াহেদের নিষ্ক্রিয়তার পাশাপাশি আওয়ামীগের শীর্ষ নেতাদের সাথে আতাঁত করে চলার বিষয় উল্লেখ করে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানায় স্থানীয় নেতারা। এক যুগেরও বেশি সময় আগে গঠিত কমিটির ঐ সভাপতির বিরুদ্ধে জেলা কমিটি আহূত সভায় যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ তোলেন অনেক নেতা। একই ধরনের অভিযোগ ওঠে তালা ও কলারোয়া উপজেলাসহ কলারোয়া পৌর কমিটির সভাপতি, সম্পাদকসহ কয়েক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে। জেলা কমিটির নির্ধারিত মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হতে নিরুৎসাহিত করায় এসব নেতার বিরুদ্ধে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতারা তীব্র ক্ষোভ এবং অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
সভায় অভিযোগ করা হয় যে দেবহাটা উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক গত এক দশকে কোনো মামলার আসামি হয়নি এবং কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে গত দশ বছরে একটিও রাজনীতিক কর্মসূচি পালন করা হয়নি। তারা শুধু পদ আঁকড়ে থাকলেও সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ না নিয়ে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। অনেকে আবার অভিযোগ করেন এসব শীর্ষ নেতারা জামায়াতের ঘাঁড়ে ভর করে রাজনীতিক কর্মসূচি পালনের জন্য গত ছয়/সাত বছর ধরে অপেক্ষা করেছে। কিন্তু জামায়াত এর রাজনীতিক কোনো তৎপরতা না থাকায় বেকায়দায় পড়ে এসব নেতা দলীয় পদ আঁকড়ে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। জেলার প্রতিটি উপজেলা ও পৌর কমিটি দশ বছরেরও বেশি সময় আগে গঠিত দাবি করে অবিলম্বে তা পুনর্গঠনের দাবি তোলেন উপস্থিত নেতারা।
সভায় অভিযোগ করা হয় তালা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মৃনাল কান্তি রায় এবং সফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের পর কোনো জিডি পর্যন্ত হয়নি। অথচ প্রতিটি উপজেলার হাজার হাজার নেতা-কর্মী সমর্থক ৩০/৩৫ টি পর্যন্ত মামলার আসামি হয়েছে।
অনেকে মারা যাওয়ার পরও আসামি হয়েছে উল্লেখ করে কয়েক নেতা অভিযোগ করেন যাঁরা পদে রয়েছেন তারা কোনো যাদুবলে আসামীভুক্ত হয়নি বিষয়টি জনসম্মুখে জানাতে হবে। কোনো কোন নেতার অভিযোগ তিন কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম, কাজি আলাউদ্দীন ও ডাঃ শহিদুল ইসলাম অর্ধ্ব যুগেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় নেতা-কর্মী সমর্থকদের থেকে বিচ্ছিন্নœ। জেলা বিএনপিতে তাদের নিজস্ব বলয় সৃষ্টির চেষ্টার কারণে স্থানীয় নেতা-কর্মী সমর্থকরা আত্মকোন্দলে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক নেতার বিরুদ্ধে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে প্রাচরনারও অভিযোগ তোলেন তৃণমুলের অসংখ্য নেতা।
অভিযোগ ওঠে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডাঃ শহিদুল ইসলামের আপন মামাত ভাই নলতা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম খোকন আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ায় সেখানে বিএনপিতে স্থবিরতা চলছে। গত আট বছরেও দেবহাটা উপজেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি বলে অভিযোগ জানান স্থানীয় নেতারা।
সভায় উপস্থিত অসংখ্য নেতার অভিযোগ তারা হাজার হাজার মানুষ ৩০/৩৫ টি পর্যন্ত মামলার আসামি হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করলেও অনেক শীর্ষ নেতা তাদের ও পরিবারের খোঁজখবর পর্যন্ত নেয়নি। এমনকি এখনও রাজনীতিক হয়রানীর শিকার হওয়ার আতঙ্কে শীর্ষ এসব নেতা রীতিমত কর্মী সমর্থকদের এড়িয়ে চলে। পদ সর্বস্ব কর্মী সমর্থক বিচ্ছিন্ন এসব নেতার সরিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে ওয়ার্ড, ইউনিয়নসহ উপজেলা কমিটিসমুহ পুনর্গঠনের দাবি জানান তারা।
সভায় অংশ নেয়া তৃনমুলের নেতা-কর্মীরা দাবি জানান সাংগঠনিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া কমিটিসমুহ বিলুপ্ত করে মেধাবী, ত্যাগী, সাহসী নেতাদের দায়িত্ব দিতে হবে। অন্যথায় কার্যক্রমহীন নিস্ক্রিয় অথর্ব্য কমিটির দেখিয়ে দেওয়া পথে হাটলে বিএনপি রাজনীতির আরও করুন দশা হবে।
এদিকে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির পুরানো রোগ “আত্মকোন্দল”র সুযোগ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকা তিন নেতার কয়েক অনুসারী জেলা বিএনপি আহূত এসব মতবিনিময় সভা অকার্যকর করার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবদুর রাজ্জাক, নুর ইসলাম ও আবদুর রশিদসহ অসংখ্য নেতার অভিযোগ জেলা বিএনপি আহূত এসব সভায় অংশ না নিতে মুষ্টিমেয় শীর্ষ নেতা তাদেরকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করে। নাজমুল হোসেন, আল ফারুক, আবু হাসানসহ আরও অনেকে বলেন, দশ বছর পরে হলেও জেলা নেতৃবৃন্দ মতবিনিময়ের জন্য উপজেলার পাশাপাশি ওয়ার্ড বিএনপি এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাদের আহবান জানিয়ে বিএনপিকে চাঙ্গা করেছে। দলের এই দুঃসময়েও যাঁরা সংগঠনের অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
এদিকে বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর কমিটিসহ ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড বিএনপি নেতাদের সাথে মতবিনিময় নিয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ্যাড. সৈয়দ ইফতেখার আলী বলেন, দায়িত্ব পেয়ে সবাইকে নিয়ে দলকে চাঙ্গা করার চেষ্টা চলছে। হাতে গোনা কয়েক নেতার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনটি ইউনিট সভায় না আসায় তৃণমুল নেতকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সভায় অংশ নেয়া বিভিন্ন নেতা তাদের নিজ নিজ এলাকার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সাংগঠনিকভাবে ব্যর্থ নেতাদের পরিবর্তে ত্যাগী মেধাবী এবং পরীক্ষিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়ে মেয়াদ উত্তীর্ন কমিটিগুলো পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে।