ঘুির্নঝড় ‘বুলবুল’ এর তান্ডবে দক্ষিন-পশ্চিম উপকুলীয় জনপদ শ্যামনগর উপজেলা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। উপকুলবর্তী এ জনপদের সবগুলো ইউনিয়নে শত শত কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ হওয়ার পাশাপাশি কয়েক লাখ গাছ উপড়ে পড়েছে। দেয়াল চাপা পড়ে দুই জন আহত হলেও ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে লাখো মানুষ।
মুলত প্রশাসনের উদ্যোগে বুলবুল তান্ডবের আগেই উপকুলবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়ার জীবনহানির ঘটনা না ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতিতে আগের যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ছাড়িয়ে গেছে। এই মুহুর্তে সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় স্থানীয়দের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
হাজার হাজার হেক্টর চিংড়ীর ঘেরসহ আমনের ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ছাড়াও বিভিন্ন অংশে কেয়ারের রাস্তা বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। গাছ-গাছালী পড়ে এবং বিদ্যুৎ এর খুটি উপড়ে যেয়ে সমগ্র উপজেলা বিদ্যুৎ বিহীন হওয়ার পর সোমবার দুপুর পর্যন্ত উপজেলার পঁচানব্বই ভাগ এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। যার ফলে গোটা উপজেলাজুড়ে এক ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
মোবাইল পরিসেবাও মারাত্বকভাবে বিঘিœত হওয়ায় মানুষ একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি গত দুইদিন।
প্রসংগত বঙ্গপোসাগরে সৃষ্ট ঘুর্নিঝড় ‘বুলবুল’ রোববার রাত তিনটার পরপরই উপকুলীয় জনপদ শ্যামনগরের উপর আঘাত হানে। এর আগে বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া ঘুর্নিঝড় শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিম উপকুলে আঘাত হানার সম্ভাবনা থাকলেও শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে তা ভারতের গোসাবা ও দিঘার দিকে চলে যায়। কিন্তু রাত আড়াইটার পরপরই গতিপথ পরিবর্তন করে ‘বুলবুল’ বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে শুরুতেই সাতক্ষীরার শ্যামনগরের উপর আঘাত হানে। ভোর তিনটা থেকে রোববার সকাল প্রায় আটা পর্যন্ত চলে বুলবুলের তান্ডব। শুরুতে বৃষ্টি থাকলেও সকালের পর থেকে তীব্র বেগের দমকা বাতাসের কারণে আইলায় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন অংশের কয়েক লাখ গাছ উপড়ে পড়ে।
এদিকে ভোরের দিকে বৃষ্টি এবং বেলার সাড়ে আটার পর ঝড়ো বাতাস থেমে গেলে গোটা উপকুলীয় এ জনপদজুড়ে এক ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। গাছ-গাছালী পড়ে শ্যামনগর কালিগঞ্জ, শ্যামনগর-নুরনগর, শ্যামনগর-নওয়াবেঁকী সড়কসহ যানবাহন চলাচলের সবগুলো সড়ক বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে আগের রাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্বল্প ও দূর পাল্লার যাত্রী কিংবা পণ্যবাহী কোন যানবাহন রোববার বেলা এগারটা পর্যন্ত চলাচল করতে পারেনি।
এক পর্যায়ে বুলবুলের তান্ডব থেমে যাওয়ার পরপরই স্থানীয়রা নিজ নিজ উদ্যোগে বাড়ির সম্মুখভাগ হতে উপড়ে পড়া গাছ-গাছালী অপসারনের চেষ্টা শুরু করলে শ্যামনগর-কালিগঞ্জসহ কয়েকটি সড়ক স্বল্পভাবে সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়।
সরেজমিনে দেখা যায় বিশালাকারের অসংখ্য গাছ ৩৩ হাজার ভোল্ট এর বিদ্যুৎ এর তারের উপর পড়ার পাশাপাশি বেশকিছু বিদ্যুৎ এর খুটি উপড়ে যাওয়াতে শুক্রবার রাত থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত গোটা উপজেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের তৎপরতায় সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে শুধুমাত্র শ্যামনগর উপজেলা সদরের স্বল্প জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলেও আগামী চার/পাঁচ দিনের আগে সমগ্র শ্যামনগরে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে না বলে নিশ্চিত করেছে শ্যামনগরের দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি রোববার ভোর রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকায় উপজেলার বিভিন্ন অংশে মারাত্বক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কালিঞ্চি, তারানীপুর, ঠাকুরঘেরী, ভেটখালী, কুপোট, বিড়ালাক্ষী, নৈকাটিসহ বিভিন্ন এলাকার কেয়ারের রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। বাঁধ না ভাঙা সত্ত্বেও টানা বৃষ্টিতে উপজেলার গাবুরা, পানখালী, কদমতলা, ভুরুলিয়া, বুড়িগোয়ালীনি, পদ্মপুকুর, কৈখালী, মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার ছোট বড় কয়েক হাজার চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার পাশাপাশি গোলাখালী, আবাদচন্ডিপুর, সোরাসহ অসংখ্য জায়গায় কাঁচা রাস্তা শনিবার থেকেই পানিতে তলিয়ে রয়েছে। আবার অনেক জায়গার রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে উপজেলা সদরের উত্তর বাদঘাটা গ্রামের ভিক্ষুক নিহার বেগম ও জোছি বেগমসহ একই গ্রামের হযরত আলী, আজিদা বিবি, লোকমান মিস্ত্রি, তারানীপুরের আকতার হোসেন, ভ্যানচালক পলাশ এবং বংশীপুর পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন নুর ইসলাম, আমির আলী, আবদুর রশিদসহ শত শত মানুষের বসত ঘর সম্পুর্নভাবে বিধ্বস্থ হয়েছে। মুলত এসব ঘরের উপর গাছ পড়ায় তা বিধ্বস্থ হয় বলে স্থানীয়দের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থদের দাবি।
তবে এবারের বুলবুল মোকাবেলার প্রস্তুতি হিসেবে শুরুতে মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রসমুহে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখালেও রোববার ভোর রাতে ঝড়ের পুর্ব মুহুর্তে হাজার হাজার মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে নিজের ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে।
যদিও এর আগে রোববার রাতেই প্রায় পৌনে এক লাখ মানুষকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। আশ্রিতদের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরন করা হয়।
এদিকে বুলবুল এর আঘাতের পরপরই বেলা দশটার দিক থেকে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহনকারীরা নিজের বিধ্বস্থ বাড়ি ঘরে ফিরে যায়।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে আপাতত ক্ষতিগ্রস্থদের দশ কেজি করে চাউল দেয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে তালিকা তৈরীর পর সরকারিভাবে অন্যান্য সহায়তা প্রদান করা হবে।