“মোরা এক সোমায় গাঙ্গের ধারে বইয়া ওই পাড়ের মানুর সাতে কতা কইতাম। এ্যাহোন হেই গাঙ্গ ভাইঙ্গ্যা বড় অইয়্যা গ্যাছে। এই গাঙ্গে মোগো ঘর-বাড়ী জায়গা জমি ভাইঙ্গ্যা গ্যাছে। মোরা জায়গা জমি খুঅ্যাইয়্যা গরিব অইয়্যা গেছি। মোগো ২০ একর জমি গাঙ্গে ভাইঙ্গ্যা গ্যাছে”। এ কথা বলেছেন তালতলীর মৌপাড়া গ্রামের ৮৫ বছর বয়সি ওয়ারেচ কাজী। নদীর ভাঙ্গনে আয়তনে ছোট হয়ে আসছে আমতলী ও তালতলী উপজেলা। নদী ভেঙ্গে পূর্বের চেয়ে প্রস্থ তিনগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে কয়েক হাজার একর জমি, সরকারী স্থাপনা ও ঘর বাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ফসলি জমি ও ঘর বাড়ী হারিয়ে পথে বসেছেন হাজারো পরিবার। ভয়াল পায়রা নদীর ভাঙ্গনের হাত থেকে ফসলি জমি ও ঘর-বাড়ী রক্ষায় দ্রুত ব্লক নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
জানাগেছে,প্রমত্তা বুড়িশ্বর বা পায়রা নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৯০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ছিল ১২০০ মিটার। নদীটির দৈঘ্য ঠিক থাকলেও গড় প্রস্থ ভেঙ্গে হয়েছে ৩৫০০ মিটার। নদী ভেঙ্গে পূর্বের চেয়ে প্রস্থ তিনগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে ভয়াল পায়রা নদী উত্তাল হয়ে অগ্নিরুপ ধারণ করে। প্রচন্ড ঠেউ ও জোয়ার-ভাটার তীব্র স্রােতে নদী ভেঙ্গে আকারে বড় হচ্ছে। গত ২০ বছরে নদীর পাড়ের হাজার হাজার একর ফসলি জমি ও হাজার হাজার পরিবারের ঘর-বাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ভিটা মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে প্রায় লক্ষ মানুষ। ১৯৬৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড পায়রা নদীর সোবল থেকে মানুষ রক্ষায় বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মাণ করে। ২০০৭ সালে ঘুর্ণিঝড় সিডরে ওই বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙ্গে পায়রা নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। আমতলী ও তালতলীর ৩০ কিলোমিটার পায়রা নদীর চাওড়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঘটখালী, পৌর শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ড, লোচা, আড়পাঙ্গাশিয়ার পশুরবুনিয়া, বালিয়াতলী, পচাঁকোড়ালিয়া স্লুইজ, মৌপাড়া, গাবতলী, নকড়ি, তেতুঁলবাড়িয়া ও জয়ালভাঙ্গা এলাকায় পায়রা নদীতে ভেঙ্গে বিলিন হয়ে গেছে। ওই সকল এলাকায় বসবাসরত মানুষ ভিটে মাটি ছেড়ে অনাত্র অবস্থান নিয়েছে। প্রতিদিনই ওই সকল স্থান দিয়ে ঠেউ ও প্রবল স্রােতের চাপে নদীর পাড় ভাঙ্গছে। নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষায় এলাকাবাসী ব্লক নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঘটখালীর ৫০০ মিটার,আমতলী পৌর শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ফেরীঘাট পর্যন্ত ১২০০ মিটার, লোচা ৫০০ মিটার, পশুরবুনিয়া ১০০০ মিটার, বালিয়াতলী ২০০০ মিটার, মৌপাড়া ২০০০ মিটার, গাবতলী ৫০০ মিটার, তেতুঁলবাড়িয়া ১০০০ মিটার ও জয়ালভাঙ্গা ২০০০ মিটার পায়রা নদীর পাড় ভেঙ্গে গেছে। ওই সকল এলাকায় সরকারী স্থাপনা, ঘর-বাড়ী ও ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ওই স্থানগুলোতে বসবাসরত পরিবারগুলো ভিটে মাটি ছেড়ে খুপরি ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেক পরিবার ভিটে মাটি হারিয়ে জন্মভুমি ছেড়ে কাজের সন্ধানে পরিবার পরিজন নিয়ে রাজধানী শহর ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে চলে গেছে।
আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের বালিয়াতলী গ্রামের সাইদুর রহমান জানান, পশুরবুনিয়া, বালিয়াতলীর প্রায় চার কিলোমিটার স্থান জুড়ে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ী পায়রা নদীতে ভেঙ্গে বিলিন হয়ে গেছে। দ্রুত এ এলাকায় ব্লক নির্মাণ করে নদীর ভাঙ্গন রোধ করা না হলে, এখানে বসবাসরত কয়েক শত পরিবার ভিটা মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে।
তালতলীর তেতুঁলবাড়িয়া গ্রামের আলমগীর হাওলাদার বলেন, তেতুলবাড়িয়া ও জয়ালভাঙ্গায় পায়রার ভাঙ্গন থামছেই না। প্রতিদিন ভেঙ্গে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বিকেলে জমিতে ফসল রোপন করে এসেছি। পরের দিন সকালে গিয়ে ওই স্থান আর খুঁজে পাচ্ছি না। দ্রুত ব্লক নির্মাণ করে পায়রার ভাঙ্গন রোধের দাবী জানাই।
আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মোঃ মতিয়ার রহমান বলেন, পায়রার ভাঙ্গনে দিন দিন আমতলী উপজেলা ও পৌরশহর আয়তনে ছোট হয়ে আসছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাবী জানাই।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী আজিজুর রহমান সুজন বলেন, পায়রা ভাঙ্গন রোধে পশ্চিম ঘটখালী, আমতলী পৌরসভা, পশুরবুনিয়া, বালিয়াতলী, মৌপাড়া, জলায়ভাঙ্গা ও তেতুঁলবাড়িয়ার প্রায় ১০ কিলোমিটার পাড় নদী ভাঙ্গন রোধের চতুর্থ স্তরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান অফিসে তালিকা করে পাঠিয়েছি।